নিরাপদ স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠনে সরকার বদ্ধপরিকর : প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল জাতীয় পরিবেশ পদকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার প্রদান করেন : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল জাতীয় পরিবেশ পদকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার প্রদান করেন : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠন করতে বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই লক্ষ্যে নেয়া সরকারের উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। গতকাল সকালে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এবারের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য ‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

বাংলাদেশকে সব প্রাণী ও প্রাণের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃক্ষরোপণ কেবল বনায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এমন একটি বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, গাছপালা, মাটি, পানি ও বায়ু স্বাভাবিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে। আমি যে কথাটি মনে করি, সেই কথাটি আপনাদের সামনে বলতে চাইছি, সেটি হলো- দেশ হোক সব প্রাণী এবং প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ মেলা ও বৃক্ষমেলার আয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। তবে এ আয়োজন কেবল বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো এই যে বিষয়টা, এটা আমাদের একটা নৈমিত্তিক অভ্যাসে যদি আমরা পরিণত করতে পারি, তাহলে আমরা সবার বক্তব্যে যে কথাগুলো বলি যে, একটা স্বাস্থ্যকর বসতি গড়ে তোলা দরকার, আমাদের গড়ে তোলা উচিত, এগুলো তাহলে ধীরে ধীরে আসলেই বাস্তবে রূপ নিতে পারবে। দেশজুড়ে পরিবেশকর্মী, বৃক্ষরোপণ ও বাগান তৈরির সাথে যুক্ত মানুষ এবং প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের মতো মানুষের সংখ্যা বাড়লে বাংলাদেশে একটি সবুজ বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সবুজ বসতি গড়ে তুলতে সন্তান জন্মের সাথে সাথে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃক্ষরোপণ কিংবা সবুজের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই অবগত আছি। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ঢাকা শহরকে যত সবুজ দেখতাম, এখন বোধহয় দেখি না। এটার সাথে নিশ্চয়ই আপনারা কেউ আমার সাথে দ্বিমত করবেন না, সবাই নিশ্চয়ই একমত হবেন।

যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি লন্ডনে যে পাড়াটায় থাকতাম, আমার তিন-চারটি বাসা পরে একটা বাসা ছিল, তিনতলা বাসা। সেই বাসার সামনে দু’টি গোলাপগাছ ছিল দরজার দু’পাশে। গোলাপগাছগুলো বেড়ে বেড়ে প্রায় তিনতলা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। একদিন বাসার মালিকের সাথে আমার দেখা হলো। আমি বললাম যে, তোমার এই গাছগুলো খুব সুন্দর। দূর থেকে খুবই সুন্দর লাগে দেখতে। বাড়িটির মালিকের তিনটি সন্তান উল্লেখ করে তিনি বললেন, যখন আমার যেই সন্তান জন্ম হয়েছে, আমি তখন তার নামে একটি করে গাছ লাগিয়েছি। দুটো সামনে আছে, একটা বাসার পেছনে আছে। তিনটা গাছ এখন বড় হয়ে প্রায় তিনতলার সমান হয়ে গেছে। দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে দিন থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, দেশে ফিরলে, আমার পক্ষে কখনো সুযোগ হলে এই কথাটি আমি বলার চেষ্টা করব।

পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি নিয়েছে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া গাছ লাগালে এ লক্ষ্য পূরণ হলেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, কোন পরিবেশে, কী ধরনের মাটিতে, কী আবহাওয়ায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো উচিত, এটি সম্পর্কেও কমবেশি আমাদের একটি ধারণা থাকতে হবে এবং সেই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই গাছগুলোকে আমাদের রোপণ করতে হবে। নতুন বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির গাছ, যেমন : ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয় বনজ, ফলদ, অর্থকরী ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা খুবই দরকার।

সরকারপ্রধান বলেন, বৃক্ষরোপণ বা বনায়নই শেষ কথা নয়। বনায়ন পশুপাখি, বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিতে পারছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ আমরা অনেক গাছ কেটে ফেলার কারণে অনেক পোকামাকড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সেটিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।

সবুজায়নে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবুজের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবে আমরা অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা সরকার গঠন করার পরে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছি। একই সাথে ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ চালু এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ড-সহ বেশ কিছু উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। সরকারের এই উদ্যোগগুলো যদি আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে অবশ্যই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীসহ বিশেষ করে সারা দেশের সব নগর, বন্দর এবং শহরতলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেই কিন্তু আমূল পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে আনতে হলে এটি শুধু নগর প্রশাসন কিংবা পুলিশ দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমাদেরকে এওয়ারনেসের মাধ্যমে এটা করতে হবে। অনুগ্রহ করে যেখানে সেখানে বর্জ্য কিংবা উচ্ছিষ্ট ফেলবেন না দয়া করে।

অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ এবং বনায়ন অংশীজনের মধ্যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পূর্ব পাশে দু’টি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর পাশে পুরনো বাণিজ্যমেলার মাঠে বৃক্ষমেলা-২০২৬ -এর উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী হেঁটে হেঁটে বৃক্ষমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছিল না : বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। ছিল ব্যানার-ফেস্টুন। শুধু ছিল না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি। অনুষ্ঠানে অতিথিদের অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন যে, সরকারি অনুষ্ঠানে তার ছবি যেন ব্যবহার না করা হয়। তার নির্দেশের প্রতিফলন গতকালের অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে। গত ৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ-সংক্রান্ত নির্দেশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরিপত্র জারি করে।