খামেনির জানাজায় শোকাতুর ইরানিদের প্রতিশোধের হুঙ্কার

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

কফিনের পাশে তিন ছেলে, নেই উত্তরসূরি মোজতবা

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মৃত্যুদণ্ড দাবি, রাজপথে প্রতিশোধের লাল ঝাণ্ডা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় রাজধানী তেহরানে গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করেই সমবেত হয়েছেন লাখো শোকাতুর জনতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহত নেতার শেষ বিদায়ে ইরানজুড়ে এখন বইছে প্রতিশোধের তীব্র আকাক্সক্ষা। এই শোকসভা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যুদণ্ড দাবি এবং এই হত্যাকাণ্ডের কঠোর প্রতিশোধ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও এই শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে আবারো তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

শনিবারের পর গতকাল রোববারও তেহরানের ইমাম খোমেনী গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় খামেনির সাথে তার মেয়ে, জামাতা, পুত্রবধূ এবং ১৪ মাস বয়সী এক নাতনী নিহত হন। ওই হামলার পর দীর্ঘ চার মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সম্প্রতি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও দেশের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডে ইরানি জনগণের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। হাতে ইরানি পতাকা আর প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে সাধারণ মানুষ স্লোগান দিচ্ছেন- ‘আমেরিকা নিপাত যাক’, ‘ইসরাইল নিপাত যাক’।

জানাজা ও শোকসভার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট ইরানি কবি মোহাম্মদ রাসুলি। তিনি মাইকে সমবেত জনতার উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন তোলেন, কেন এই অপরাধী এখনো বেঁচে আছে? তার এই বক্তব্যে সমবেত জনতা উচ্চকণ্ঠে সমর্থন জানায়। শোকসভায় উপস্থিত ৪২ বছর বয়সী সেবিকা জিবা নাদেরি বলেন, “আমরা প্রতিশোধের ডাক শুনছি। তবে আমাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশই আমরা পালন করব। আমাদের তার প্রতি অনুগত থাকতে হবে।” মোসাল্লা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন দেয়ালে ও পোস্টারে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর ফাঁসি ও হত্যার দাবি সংবলিত গ্রাফিতি দেখা গেছে।

এ দিকে খামেনির জানাজায় তার তিন ছেলে মোস্তফা, মেয়সাম ও মাসুদ খামেনিকে কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে ও মুনাজাত করতে দেখা গেলেও তার উত্তরসূরি তথা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ বিমান হামলায় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হন। তার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে এবং পায়ে মারাত্মক আঘাত লেগেছে। নতুন নেতাকে একনজর দেখার জন্য অনেক সাধারণ মানুষ ভিড় করলেও তার অনুপস্থিতি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এক ধরনের রহস্যের জন্ম দিয়েছে। জানাজায় ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

অন্যদিকে খামেনির জানাজায় সামনের সারিতে দেখা গেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ওয়াহিদীকে। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে তৎকালীন আইআরজিসি প্রধান হোসেইন সালামি নিহত হওয়ার পর মোহাম্মদ পাকপুরকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধে পাকপুরও নিহত হন। ওয়াহিদীর উপস্থিতি আইআরজিসি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করেছে।

কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জানাজাকে ঘিরে প্রথম দুই দিনেই তেহরানের মেট্রো রেলে রেকর্ড ৭০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছেন। আজ সোমবার তেহরানে মূল জানাজা ও গণমিছিল শেষে খামেনির লাশ শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কোম নগরীতে নেয়া হবে। এরপর বুধবার ইরাকের পবিত্র কারবালা ও নাজাফ শহরে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। রাষ্ট্রীয় এই আয়োজনে অংশ নেয়া লাখ লাখ মানুষের জন্য যাতায়াত, খাবার ও বাসস্থানের বিশেষ ব্যবস্থা করেছে ইরান সরকার।

এই বিশাল জানাজা ও শোকসভার কারণে ওয়াশিংটনের সাথে চলমান শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি উল্লেখ করেছেন, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালীন উভয় পক্ষই কোনো প্রকার সামরিক উসকানি বা হামলা থেকে বিরত থাকবে। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী এই সময়টাকে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। দেশটির সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এক সতর্কবার্তায় বলেছেন, “আমরা এই যুদ্ধবিরতির সময়টিকে আমাদের সামরিক ও যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে লাগাচ্ছি। শত্রুপক্ষ যদি সামান্যতম ভুলও করে, তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের দাঁতভাঙা ও চূড়ান্ত জবাব দেবে।”

এই যুদ্ধে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় দেশটির বেশ কিছু সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি খাত এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি ডলার। সরকারি তথ্যমতে, এই যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাসহ তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

তবে এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও ইরান তার সামরিক সক্ষমতার জানান দিয়েছে। পাল্টা আঘাত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করেছে। তেলের দামের এই আকস্মিক বৃদ্ধির কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধবিরতির চুক্তি করতে বাধ্য হন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের শত কোটি ডলারের তহবিল অবমুক্ত করা হবে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।

এ দিকে নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনীর তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘উইন্ডওয়ার্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ওমান করিডোর দিয়ে চলাচলকারী অন্তত ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ আইআরজিসির টহলের কারণে তাদের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। ইরান এই অঞ্চলে তাদের নিজস্ব ‘নিরাপদ রুট’ ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে বেতার বার্তা দিচ্ছে, যা অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। তবে এই শোকের আবহ পারমাণবিক চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনাকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।