যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতাস্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহে তেহরানের ওপর মার্কিন বাহিনীর চালানো তৃতীয় দফার তীব্র বিমান হামলার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত, জর্দান, কাতার ও ওমানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তীব্র উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বরাতে আলজাজিরা জানায়, গত এক সপ্তাহে রাতব্যাপী আবারো তিনটি অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, নৌ-স্থাপনা, গোলাবারুদ মজুদাগার ও রাডার-সহ প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ভাষ্য, বেসামরিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সামরিক পদক্ষেপ। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং ওয়াশিংটনকে তাদের কর্মকাণ্ডের মাশুল দিতে হবে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং সেনাবাহিনী জানায়, ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্দান ও হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশ এসব হামলা প্রতিহতের দাবি করেছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ওমানের দুকম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীগুলোর জন্য ব্যবহৃত রসদ সহায়তা কেন্দ্র ও জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্মে ‘ভয়াবহ ও আকস্মিক’ হামলা চালানোর খবর জানিয়েছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, হামলায় ওই স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়েছে। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে পরিচালিত অভিযানের এটি তৃতীয় ধাপ। ইরানের সেনাবাহিনী বলেছে, কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতেও একাধিক দফায় বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আইআরআইবির এক বিবৃতিতে বলা হয়, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গোলাবারুদ গুদাম এবং একটি রাডার স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ওই বিবৃতি অনুসারে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যোগাযোগব্যবস্থা ও একটি রাডার স্থাপনাও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইরানের সেনাবাহিনীর মতে দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হামলার জবাবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা বিভিন্ন উড়ন্ত বস্তু প্রতিহত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় তারা জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার কারণ হচ্ছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে হামলা প্রতিরোধের কার্যক্রম। একই সাথে জনগণকে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য, হামলায় ঘাঁটির যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। আইআরজিসি আরো জানায়, জর্দানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করেও কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। আইআরআইবির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এতে ঘাঁটির একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং এমকিউ-৯ ড্রোন সংরক্ষণের কয়েকটি হ্যাঙ্গার ধ্বংস হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে বলে জানিয়েছে। সবাইকে ঘরে অথবা নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে এবং অপ্রয়োজনীয় চলাচল এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর কিছু সময় পর রোববার সকালে দ্বিতীয় দফায় আবারো নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অন্য দিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আবারো হামলার সতর্কসঙ্কেত বাজানো হয়েছে এবং বাসিন্দাদের নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। এ দিন সকালে এটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো এমন সতর্কসঙ্কেত। এ ছাড়া আইআরজিসি বলেছে, হরমুজ প্রণালীতে ‘নিয়ম লঙ্ঘনকারী’ একটি জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। একই সাথে তারা সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে এর জবাবে আরো ‘বিধ্বংসী’ প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিরোধ চলছে। ইরানের দাবি, তাদের অনুমোদিত রুট ছাড়া অন্য কোনো পথ ব্যবহার করা যাবে না এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালীটি বন্ধ থাকবে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই সেখানে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছে।
গত মাসের সমঝোতাস্মারকটি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় এই সঙ্ঘাতের পথ আগে থেকেই খোলা ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকারের পর পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এশিয়াসহ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংযমের আহ্বান পাকিস্তানের
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে এক টেলিফোন সংলাপে তিনি এ আহ্বান জানান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঞ্চলিক বর্তমান সঙ্কটময় পরিস্থিতির বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেছেন। পাকিস্তান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সঙ্ঘাত ও উত্তেজনা নিরসনে সামরিক বা শক্তিপ্রয়োগের চেয়ে সংলাপ ও কূটনীতিই একমাত্র কার্যকর উপায়। অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামাবাদ।



