দিনাজপুর প্রতিনিধি
দিনাজপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বড় মাঠ’- এ উন্মুক্ত পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতরসহ দুই ঈদের নামাজ আদায় এবং খেলাধুলার সুযোগ বজায় রাখার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন দিনাজপুরের সাধারণ মানুষ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় এক মাস আগে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে প্রায় ২২ একর আয়তনের এই মাঠটি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে সেখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং মাঠের চার পাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়। এই বেড়ার ভেতরেই রয়েছে এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদ জামাতের স্থান, প্রশস্ত ঈদগাহ মিনার ও খেলাধুলার মাঠ।
সেনাবাহিনী কর্তৃক তারকাঁটা বেড়া স্থাপনের পর থেকেই দিনাজপুরবাসী এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। কাঁটাতারের বেড়া অপসারণ করে উন্মুক্তভাবে ঈদের নামাজ আদায় ও খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিতে শহরের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ে কোনো সমস্যা হবে না এবং খেলাধুলাও বন্ধ করা হয়নি। তবে নির্ধারিত গেট দিয়ে মুসল্লি ও খেলোয়াড়দের যাতায়াত করতে হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার পর থেকে মাঠের ভেতরে কেউ খেলতে যেতে পারছেন না এবং খেলাধুলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দিনাজপুরের বিশিষ্ট নাগরিকরাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে আগামী ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করবেন না তারা।
এ দাবিতে সম্প্রতি দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সড়কে একাধিক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদগাহ মিনার অবস্থিত। পাশাপাশি এই মাঠ থেকেই জাতীয় দলের ক্রিকেটার লিটন দাসসহ অসংখ্য ক্রীড়াবিদ তৈরি হয়েছেন। বর্তমানে মাঠটিতে পাঁচটি ক্রিকেট একাডেমির কয়েক শ’ খেলোয়াড় নিয়মিত অনুশীলন করেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাঠটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখায় খেলাধুলা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তারা অবিলম্বে তারকাঁটা বেড়া অপসারণ করে জেলাবাসীর অবাধ চলাচল ও খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
আন্দোলনে বক্তব্য দেন দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র মেসাদ্দেক হোসেন লাবু, দিনাজপুর চেম্বারের প্রতিনিধি আকতারুজ্জামান জুয়েল, পিয়াল আহমেদ, গোলাম নবী দুলাল, বিশিষ্ট নাগরিক রেজাউর রহমান রেজু, সুলতান কামাল উদ্দিন বাচ্চু, অ্যাডভোকেট মেহেরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউন্সিলর ও দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্য রেহাতুল ইসলাম খোকা প্রমুখ।
উল্লেখ্য, দিনাজপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডকৃত প্রায় ২১.৯৯ একর জমি। ভূমি নথিতে এর ব্যবহার হিসেবে বাগান, খেলার মাঠ, মাজার, মসজিদ ও পতিত জমি উল্লেখ রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে জনসাধারণের ব্যবহারের প্রমাণ বহন করে।
ব্রিটিশ আমলে দিনাজপুরে কোনো স্টেডিয়াম না থাকায় এই মাঠেই বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ফুটবল জাদুকর সামাদের প্রথম ও শেষ ম্যাচও এই মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। ব্রিটিশ আমলে ঘোড়দৌড় এবং পাকিস্তান আমলে নর নারায়ণ শিল্ড ফুটবল প্রতিযোগিতাও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানেও ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, ঘুড়ি উৎসব, বাণিজ্যমেলা ও কৃষি মেলাসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে মাঠটি মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে। ১৯৮৯ সালের ১৪ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জিয়াউর রহমান বড় মাঠের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২৮.৫০২ একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দেন।
পরে ২০০৩ সালে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদে সিদ্ধান্ত হয়, দিনাজপুরের বড় মাঠ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জমি হলেও তা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য হিসেবে ‘যেমন আছে তেমন’ থাকবে। এ ছাড়া ২০০৭ সালের ১৬ মে বড় মাঠ বিষয়ে ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও রংপুর এরিয়া কমান্ডারের উপস্থিতিতে দিনাজপুর সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায়ও মাঠটির মালিকানা ও ব্যবহার জনসাধারণেরই থাকবে বলে মত দেয়া হয়।
বর্তমানে মাঠে দিনাজপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দিনাজপুর স্পোর্টস ডিসপ্লে, শিশু পার্ক (পুরনো ও নতুন), গোর-এ-শহীদ জামে মসজিদ, শাহ আমির উদ্দীন ঘুরী রহ: মাজার, হাজী মোহাম্মদ দানেশের মাজার, স্টেশন ক্লাব, জরুরি নাগরিক ব্যবহারের হেলিপ্যাড, ক্রিকেট একাডেমি ও ফুটবল মাঠসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার প্রায় সবই জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্মিত। স্থানীয়দের মতে, মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে জনজীবনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এখানে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।


