কাজী সিরাজের কবলে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প

দেশবিরোধী অসম চুক্তির মাধ্যমে ২০০০ কোটি টাকা লোপাট

চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করেই পুরো বিল তুলে নিয়ে গেছেন। আবার একই প্রতিষ্ঠানকে অসম চুক্তির মাধ্যমে বিনা টেন্ডারে কাজ দেয়া হয়েছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম শিলা খনি অঞ্চলগুলোর একটি।
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম শিলা খনি অঞ্চলগুলোর একটি। |সংগৃহীত
  • পতিত সরকারের প্রতিমন্ত্রীর সাথে ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক
  • অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই বদলি হয়রানির শিকার হতে হতো কর্মকর্তাদের
  • অযৌক্তিক দাবি না মানায় ৫ জন এমডি ও ১২ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়
  • ঠিকাদারের স্বেচ্ছাচারিতায় অবিক্রীত আছে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার পাথর
  • দেনার দায়ে ডুবতে বসেছে প্রকল্পটি

নোয়াখালী জেলা কৃষকলীগের সভাপতি ও জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) চেয়ারম্যান কাজী সিরাজউদ্দীনের কবলে পড়েছে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলেও আচরণ করেন মালিকের মতো। আর তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর। এ কারণেই ঠিকাদার কাজী সিরাজ হয়ে উঠেছিলেন প্রকল্পটির একচ্ছত্র অধিপতি। বিপু গংদের সহযোগিতায় অসম চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটির দুই হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে সিরাজের বিরুদ্ধে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করেই পুরো বিল তুলে নিয়ে গেছেন। আবার একই প্রতিষ্ঠানকে অসম চুক্তির মাধ্যমে বিনা টেন্ডারে কাজ দেয়া হয়েছে। কাজী সিরাজের স্বেচ্ছাচারিতায় উত্তোলিত সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার পাথর অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। এভাবে লোকসানের মুখে ফেলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ধার করে ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তার এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে পারতেন না। কেউ কথা বললেই বদলি, পদোন্নতি বঞ্চিত করাসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এভাবে গত ১১ বছরে পাঁচজন এমডি ও ১২ কর্মকর্তাকে বদলি হতে হয়েছে। কাজী সিরাজের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি) ১৯৭৪ সালে ভূতল থেকে ১২৮-১৩৬ মিটার গভীরতায় মধ্যপাড়া খনিটি আবিষ্কার করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে কানাডার মেসার্স এসএনসি লিমিটেড সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা এবং ১৯৮৮-৮৯ সালে জাপানের মেসার্স নিপ্পন কো.ই দ্বারা আর্থিক ও বাজার সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সমীক্ষাগুলোতে মধ্যপাড়া খনির বাস্তবায়ন লাভজনক হিসেবে প্রতিবেদন দেয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এবং উত্তর কোরিয়ার সরকারের মধ্যে অর্থনৈতিক, কারিগরি, বৈজ্ঞানিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ধারাবাহিকতায় মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পেট্রোবাংলা এবং উত্তর কোরীয় ঠিকাদার মেসার্স নামনামের মধ্যে ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ মোট ১৫ কোটি ৮৮ লাখ ডলার মূল্যের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দৈনিক তিন শিফটে সাড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন অর্থাৎ বার্ষিক সাড়ে ১৬ লাখ মেট্রিক টন গ্রানাইট পাথর উত্তোলনের চুক্তি করা হয়। খনি প্রকল্পের কাজ ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের ২৫ মে খনি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। খনির ডিজাইন অনুযায়ী দৈনিক তিন শিফটে সাড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও মধ্যপাড়া গ্রাইনাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)-এর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নভেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত খনি থেকে এক শিফটে গড়ে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন পাথর উৎপাদন সম্ভব হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক এলাহীসহ তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর মিলিত চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে বিরাট অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা এবং নোয়াখালী জেলা কৃষকলীগের সভাপতি কাজী সিরাজউদ্দীনের হাতে খনিটি লুটপাটের জন্য তুলে দেন। নভেম্বর ২০১৩ সালে মাইন ম্যানেজমেন্ট কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজীর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) সাথে বিনা টেন্ডারে একটি অসম চুক্তি করা হয়। ব্যয় ধরা হয় বৈদেশিক মুদ্রায় ১২ কোটি ৮৪ লাখ ডলার এবং দেশীয় মুদ্রায় চার কোটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার ডলারসহ মোট প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় দুই হাজার ১৬০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)। চুক্তি অনুযায়ী ছয় বছরে ৯২ লাখ মে. টন পাথর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

জানা গেছে, অসম এ চুক্তির কারণে খনি থেকে পাথর উত্তোলনে জিটিসির বিনিয়োগ করতে হয়নি, সরকারের ৬৮ কোটি টাকা অগ্রিম নিয়ে তারা কাজ শুরু করে। কথা ছিল অগ্রিম টাকা পরবর্তীতে কিস্তিতে ধাপে ধাপে পরিশোধ করবে। কিন্তু কাজী সিরাজ পরিশোধ করেননি। এর বিপরীতে কোম্পানি আদালতের আশ্রয় নেয়। সেখানে কাজী সিরাজের পক্ষে মামলায় আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ পান সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক (পরবর্তী বিচারপতি)। ওই মামলায় জিটিসি হেরে গেলে জিটিসির বিল থেকে কোম্পানি তা সমন্বয় করে। চুক্তির মেয়াদে ১২টি স্টোপ (ধাপ) উন্নয়ন করে ৯২ লাখ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের কথা থাকলেও নির্ধারিত ছয় বছরে জিটিসি মাত্র ছয়টি স্টোপ উন্নয়ন করে ৩৭ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিকটন পাথর উৎপাদন করে; অর্থাৎ চুক্তির ৩৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলে ক্ষতিপূরণ (এলডি-লিকুইডিটি ড্যামেজ) আদায় করার কথা থাকলেও নসরুল হামিদ বিপুর কারণে তা আদায় করা যায়নি। উপরন্তু পাথর উৎপাদন ৫৮ লাখ মেট্রিকটন কম হলেও জিটিসি ১১ কোটি ডলার তুলে নেয়, যা চুক্তি মূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশ। পাশাপাশি চুক্তিবদ্ধ সময়ের মধ্যে প্রায় এক বছরের বেশি সময় বিভিন্ন অজুহাতে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকে।

এ দিকে ২০১৩ সালের অক্টোবরে করা চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর প্রতিটি খাত থেকে কত অর্থ নিতে পারবে, তা নির্দিষ্ট থাকা সত্ত্বেও দুই বছর পরে নতুন একটি সম্পূরক চুক্তির মাধ্যমে প্রথম করা চুক্তির আমূল পরিবর্তন করা হয়। আর তাতেই ছয় বছরের জন্য বিভিন্ন খাতের বরাদ্দের একটি বড় অংশ ২০১৬ সালের মধ্যেই তুলে ফেলে জিটিসি। টাকা নিয়ে গেলেও তারা এ সময় পাথর তুলতে পারেনি। আবার চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদিত গুঁড়ো পাথরের (ডাস্টের) সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৮ শতাংশ হলেও বাস্তবে তা ছিল ১৪-১৫ শতাংশ। অথচ ডাস্টের বিক্রয়মূল্য অন্যান্য সাইজের গড় বিক্রয়মূল্যের এক-তৃতীয়াংশ। এ কারণে খনিটি বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং সরকার রাজস্ব হারিয়েছে। ১২টি খাতের মধ্যে একটি খাত ছিল কারিগরি উন্নয়ন করা। কিন্তু কোনো কাজ না করেই শতকোটি টাকা তুলে নেয়া হয়।

খনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অর্থ যে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ বিস্ফোরক দিয়ে খনির গভীরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, এরপর পাথর উত্তোলন করা হয়। তারা বিস্ফোরক কেনার সব টাকা খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু পাথর তোলেনি। তাহলে এই বিস্ফোরক কোথায় গেল? তথাপি গত ২০২০ সালের ২৯ জুলাই নসরুল হামিদ বিপুর নির্দেশে এমজিএমসিএল এবং জিটিসির মধ্যে আবারো একটি সাইড লেটার অ্যাগ্রিমেন্ট করে চুক্তির মেয়াদ আরো এক বছর বৃদ্ধি করা হয়, যার মেয়াদ ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর শেষ হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বদরুল ইমাম পত্রিকায় ‘মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উত্তোলনের নামে ৬০০ কোটি টাকা লোপাট’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট লেখেন, যা আমলে নিয়ে কাজী সিরাজসহ খনির ১৩ জন শীর্ষ কর্মকর্তার নামে দুদকে মামলা ও করা হয়। সংস্থাটির অনুসন্ধানে ভয়াবহ এই দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ পেয়ে চারটি মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন ১ম অনুসন্ধান কর্মকর্তা। কিন্তু জিটিসির কাজী সিরাজ আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে এবং প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ করে সেই মামলাটি দুর্বল করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ দিকে জিটিসির সাথে সম্পাদিত প্রথম চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও জিটিসির উপদেষ্টা যশোর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং যুবলীগ নেতা ফররুখ খান বাবুর নীলনকশায় বারবার বাধাগ্রস্ত করা হয়। ১ম দফায় যাবতীয় অনুমোদন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হলেও পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান গোপালগঞ্জের রুহুল আমীন তা প্রকাশের দায়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (তৎকালীন) ফজলুর রহমানকে শোকজ এবং দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। পরবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আলীকেও টেন্ডার বাতিলে রাজি না হওযায় তিন মাসের মাথায় তদকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর দুর্নীতিবাজ পরিচালক (প্ল্যানিং) আইয়ুব আলী খানের ইশারায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে গোপালগঞ্জের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার ফরিদুজ্জামানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তার নির্দেশে নানা অজুহাতে আট দফা দরপত্র দাখিলের সময়সীমা বাড়ানো হয়। মোট ১৭ জন আগ্রহী দরদাতা দরপত্র ক্রয় করে। জিটিসির কাজী সিরাজ সেই দরপত্র তো ক্রয় করেননি, বরং পূর্বের চুক্তি নবায়নের সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু ইতোমধ্যেই চুক্তির মেয়াদ কয়েক দফায় মোট ১৯ দশমিক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারী ক্রয় নীতি অনুসারে তা আর বৃদ্ধির সুযোগ ছিল না। তবুও তদকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ইঞ্জিনিয়ার ফরিদুজ্জামানের নেতৃত্বে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই চুক্তির মেয়াদ আরো ছয় বছর বাড়ানোর জন্য ২০২১ সালের ১ জুন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়। ইঞ্জিনিয়ার ফরিদুজ্জামান দরপত্র দাখিলের সর্বশেষ সময়সীমা ওই বছরের ২০ জুনের মাত্র তিন দিন পূর্বে ১৭ জুনে একই দিনে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল এবং জিটিসিকে পুনঃনিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করেন।

এতে এক দিকে সরকারি ক্রয়নীতির শর্ত বিবেচনায় না নিয়ে পূর্বের চুক্তি সন্তোষজনকভাবে সমাপ্ত না হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিস্ট সরকারের ওপর মহলের হস্তক্ষেপে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জিটিসিকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ছয় বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ দেয়া হয়; অর্থাৎ এমজিএমসিএল ও জিটিসির মধ্যে ৮৮ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিকটন লক্ষ্যমাত্রার ছয় বছর মেয়াদি আরেকটি অসম ও দেশ বিরোধী চুক্তি (চুক্তি মূল্য : বৈদেশিক মুদ্রায় ১১৮.৬ মিলিয়ন ইউএসডি এবং দেশীয় মুদ্রায় ২৬৬.৭ কোটি টাকা) স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হতে কার্যকর হয়। বর্তমানে এই চুক্তির ৪র্থ বছর চলমান রয়েছে। কাজ সম্পাদন না করেও অর্থাৎ অসম চুক্তির শর্তের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেই এই অসম চুক্তির আওতায় জিটিসি চুক্তি মূল্যেরে প্রায় ৮৫ শতাংশ তুলে নিয়েছে। অধিকন্তু ভুয়া বিল তৈরি করে খনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা করছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাসিনার আমলে জিটিসি এতটাই শক্তিশালী মাফিয়া হয়ে উঠেছিল যে, কোম্পানির কোনো কর্মকর্তার মতামত তার মতের সাথে অমিল হলেই বা অন্যায্য-ভুয়া বিল তুলতে তাকে সহায়তা না করলে তাকে অন্যত্র বদলি করে বা পদোন্নতি আটকে দিয়ে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এই মাফিয়া ঠিকাদার জিটিসি ১ম চুক্তি থেকে ২য় চলমান চুক্তি পর্যন্ত বেশ পাঁচ ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও তাদের দুর্নীতিতে সহায়তা না করায় অন্যত্র বদলি ও নানাভাবে অপদস্থ করেছে। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের বাইর গিয়ে ইতোপূর্বেও অ্যাডভান্স পেমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে মামলা করে হেরেছে, তথাপি মাসিক সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসার মতো বিষয় ও মামলার জন্য জিইয়ে রাখে। একই সাথে জিটিসি খনি কর্তৃপক্ষের মতামতের তোয়াক্কা না করে সঠিক সাইজের পাথর উৎপাদন না করায় খনিটি তার গ্রাহক হারাচ্ছে, ফলে খনি এলাকায় প্রায় ১২ লাখ টন পাথর অবিক্রীত অবস্থায় পরে আছে, যার মূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এ প্রেক্ষিতে পরপর দু’টি অসম চুক্তি পরিচালনা করতে গিয়ে খনিটি প্রায় ২৬৯ কোটি টাকা দেনায় পড়েছে।

জানা গেছে, জিটিসির কাজী সিরাজ ৫ আগস্টের পর পালিয়ে গেলেও জিটিসির উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত এবং একই সাথে যশোর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া যুবলীগের কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষক ফররুখ খান বাবুর মাধ্যমে ভোল পাল্টিয়ে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির নেতাদের সাথে সক্ষতা গড়ার চেষ্টায় আছে এবং ইতোমধ্যেই এই ঘরানার আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে। কাজী সিরাজ তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির মাধ্যমে ২য় চুক্তির ১ম তিন বছরেরই অযৌক্তিক বিলের মাধ্যমে লাভ তুলে নেয়ায় বর্তমানে নানা অজুহাতে প্রায়ই খনিটির উৎপাদন বন্ধ রেখে খনিটি ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার নির্দেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে বিশেষ সুবিধা নিয়ে সম্পাদিত দেশ বিরোধী চুক্তিগুলো চিহ্নিত করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সাথে অসম চুক্তিসমুহ রিভিউ করে বাতিলের নির্দেশনা প্রদান করেছেন তিনি। মন্ত্রণালয় হতে জিটিসির সাথে অসাধু চুক্তি সম্পাদনকারী অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং এরই অংশ হিসেবে তদকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ উজ্জামানের নামে দুদকে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।