বিশ্বে পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। তবে অর্জিত হচ্ছে না স্বয়ংসম্পূর্ণতা। পরিসংখ্যান বলছে উৎপাদনে এসেছে রেকর্ড সাফল্য। তবুও বাস্তবতায় পেঁয়াজের বাজার বারবার অস্থির হয়, দাম বাড়ে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটে না। উৎপাদন বৃদ্ধির বিপরীতে সংরক্ষণ ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, বীজ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সবমিলিয়েই প্রশ্ন উঠছে, এত সাফল্যের পরও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা কেন এখনো অধরাই থেকে যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে নেয়া সরকারের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। ওই পরিকল্পনায় ২০২০ থেকে ২০২৫ এই পাঁচ বছরে অন্তত ১০ লাখ টন উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কাটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে ২০২৪ সাল শেষও অর্জিত হয়নি স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এখন আর সেই কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন বা অগ্রগতি নিয়ে সরকারের কোনো সক্রিয় বক্তব্য শোনা যাচ্ছে না। বরং পেঁয়াজের বাজার অস্থির হলেই আলোচনায় আসছে বাজার মনিটরিং জোরদারের কথা। অথচ সরবরাহ না বাড়িয়ে কেবল বাজার তদারকি করে পেঁয়াজ বা কোনো নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবে সম্ভব নয় এ সত্য প্রতি বছরই নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ লাখ টন। বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে ৩৪ লাখ ১৭ হাজার টন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পচন, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও পরিবহনজনিত ক্ষতি বিবেচনায় নিলে মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কার্যকরভাবে বাজারে সরবরাহযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ টনে। অথচ দেশের বার্ষিক চাহিদা ৩২ থেকে ৩৬ লাখ টনের মধ্যে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই প্রতি বছর ৫ থেকে ৮ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য। এটি দীর্ঘ সময় স্বাভাবিকভাবে মজুদ করে রাখা যায় না। স্থানীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে ওজন কমে যায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং নষ্ট হয় উল্লেখযোগ্য অংশ। সহজ ও কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে পেঁয়াজ নিয়ে বছরের পর বছর এমন সঙ্কট তৈরি হতো না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য সবচেয়ে বড় শর্ত হলো পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা। তবে কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করলে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারমূল্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। সে বিবেচনায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনকে অনেকেই তুলনামূলক নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে মূলত দুই মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় শীতকালীন পেঁয়াজ এবং গ্রীষ্মকালীন বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ। উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে সরকার ও গবেষকরা গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এই পেঁয়াজ উৎপাদনের খরচ দ্রুত বাড়ছে। একই সাথে বেড়েছে বীজের দাম, সার ও শ্রমিকের মজুরি। হিসাব অনুযায়ী, গত বছর এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ত প্রায় ২৮ টাকা, এ বছর তা বেড়ে ৫০ টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পেঁয়াজ উৎপাদনে আরো বড় চ্যালেঞ্জর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশের সব জেলার মাটি এই ফসলের জন্য উপযোগী নয়। পাবনা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী ও রাজশাহী অঞ্চলেই মূলত পেঁয়াজের আবাদ বেশি। সঙ্কট ও দাম বৃদ্ধির কারণে গত এক দশকে পেঁয়াজের আবাদি জমি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বীজ ও উৎপাদন ব্যয়। এ দিকে দেশের অধিকাংশ বীজ আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটির বৈশিষ্ট্য ভারতের অনেক রাজ্যের সাথে মিল থাকায় ভারত থেকেই বীজ আমদানি যৌক্তিক হলেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই পেঁয়াজ বীজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।
এ দিকে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়, যা আগে ছিল দশম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আট লাখ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ লাখ মেট্রিক টনে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা গেলে শিগগিরই দেশ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।
গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ‘বারি পেঁয়াজ-৫’ জাতটিকে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। এটি আগাম মৌসুমে আবাদযোগ্য, স্বল্পমেয়াদি এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চফলনশীল। যেখানে দেশের জাতীয় গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১০ দশমিক ৫৬ টন, সেখানে এই জাতের ফলন ১৬ থেকে ২২ টন পর্যন্ত হতে পারে। পাবনার কৃষকেরা এই জাত ব্যবহার করে বিঘাপ্রতি ২০০ মণ পর্যন্ত উৎপাদনের নজির স্থাপন করেছেন, যা মাঠপর্যায়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
তবুও বাস্তবতা হচ্ছে উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশকে এখনো আমদানির তালিকায় থাকতে হচ্ছে। এর মূল কারণ উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রতি বছর নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয়ই তৈরি করে কৃত্রিম সঙ্কট। ফলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানির দিকে যেতে হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানিনির্ভরতা কমতে শুরু করেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ৬ লাখ ৬৭ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে এসেছে ৪ লাখ ৮১ হাজার টনে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক লাখ টনেরও কম পেঁয়াজ আমদানি করতে হতে পারে, এমনকি প্রয়োজন নাও পড়তে পারে। সরকার মৌসুমের শুরু থেকেই আমদানি বন্ধ রাখায় কৃষকরা ভালো দাম পেয়েছেন এবং উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এয়ার-ফ্লো পদ্ধতিতে সংরক্ষণ প্রযুক্তি চালু হওয়ায় এখন আগের তুলনায় অন্তত দুই লাখ টন বেশি পেঁয়াজ মজুদ করা সম্ভব হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক কম এবং পচনও অনেক কম হয়। ফলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ায় আমদানির প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ আফরোজা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে পেঁয়াজের অস্থিরতার পেছনে শুধু উৎপাদন ঘাটতি নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও দায়ী। অনেক উৎপাদক ও বড় ব্যবসায়ী বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে ভারতীয় রফতানি পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভারত রফতানি বন্ধ করলে বা দাম বাড়ালে দেশীয় বাজারেও দাম বাড়ানো হয়। ফলে সঙ্কট অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে কৃত্রিমই বেশি হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চক্র থেকে বের হতে হলে একমাত্র পথ হলো ধারাবাহিকভাবে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ানো এবং উৎপাদনের ৩০ শতাংশ অপচয় কমিয়ে আনা। উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, অধিক জমিতে আবাদ, কৃষকের জন্য প্রণোদনা, বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তার এই পাঁচটি ক্ষেত্রে একযোগে কাজ না করলে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা টেকসই হবে না। একই সাথে কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে উৎপাদন কমে যাবে, আর তখনই আবার আমদানি নির্ভরতার পুরনো চক্রে ফিরতে হবে দেশকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ যে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই অগ্রগতি স্থায়ী করতে হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের সমস্যার সমাধান জরুরি। অন্যথায় উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় হলেও বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থেকে যাবে আগের মতোই।



