বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে-শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে কি উপস্থিত থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি- এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায়।
পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়- দুই প্রতিবেশী দেশের টানাপড়েনপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে মোদির সম্ভাব্য উপস্থিতি কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয় বরং তা হতে পারে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শপথ অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দলটির চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, “এই অঞ্চল আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমন্ত্রণ পাঠানোর বিষয়টি অগ্রাধিকারে আছে। সময় কম, কিন্তু শুভেচ্ছা ও ইতিবাচক বার্তা দেয়ার ইচ্ছা রয়েছে।”
তবে এখনো ভারতের সরকার কিংবা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোদির অংশগ্রহণ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
কবিরের ভাষায়, আমন্ত্রণটি হবে পারস্পরিক সম্পর্ক উষ্ণ করার প্রতীকী উদ্যোগ।
মোদির দ্রুত অভিনন্দন : দিল্লির বার্তা কী?
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই মোদি সামাজিক মাধ্যমে তারেক রহমানকে “নির্ণায়ক বিজয়”-এর জন্য অভিনন্দন জানান। পরে দু’জনের মধ্যে টেলিফোনে কথাও হয় বলে বিএনপি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মোদির বার্তায় ছিল- বাংলাদেশের সাথে “বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার” ও “সাধারণ উন্নয়ন লক্ষ্য এগিয়ে নেয়া”-এর প্রতিশ্রুতি। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি দ্রুত নতুন নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে বাস্তববাদী কূটনীতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
কবে শপথ?
শপথের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ঝযধভরয়ঁষ অষধস জানিয়েছেন, অনুষ্ঠান “খুব শিগগিরই” সম্ভবত সোমবার বা মঙ্গলবারের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকায় প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন থেকে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও দ্রুত এগোচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মোদির উপস্থিতি?
ইন্ডিয়া টুডের মতে, মোদি যদি শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, তাহলে তা তিনটি স্পষ্ট বার্তা দেবে- প্রথমত, দিল্লি নতুন সরকারের সাথে সরাসরি কাজ করতে প্রস্তুত। দ্বিতীয়ত, অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত। তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে যৌথ কৌশল।
গত দেড় দশক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। তবে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পর ক্ষমতার পালাবদল ও সংখ্যালঘু সহিংসতার অভিযোগে সম্পর্কে শীতলতা আসে। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্ব ‘রিসেট’ বা পুনঃসমন্বয়ের কথা বলছে।
বিএনপির কূটনৈতিক অবস্থান
বিএনপি ইতোমধ্যে ভারতের সাথে “পারস্পরিক সম্মান, সংবেদনশীলতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা”-এর ভিত্তিতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দলটি জানিয়েছে, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও উন্নয়নই হবে তাদের অগ্রাধিকার।
হুমায়ুন কবির বলেন, “দুই দেশের সরকারের মানসিকতা বদলাতে হবে। জনগণের রায় স্পষ্ট- নতুন বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।”
আঞ্চলিক আমন্ত্রণ তালিকায় কারা?
বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, শুধু ভারত নয়-দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ, এমনকি পাকিস্তানসহ একাধিক রাষ্ট্রের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক কূটনীতি গড়ে তুলতে চায়।
সামনে কী?
এই মুহূর্তে সবকিছু নির্ভর করছে- আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাঠানো, দিল্লির সাড়া, সময়সূচির সমন্বয়- এসব কিছুর ওপর।
মোদি উপস্থিত থাকলে তা হবে কূটনৈতিক দৃষ্টিতে বড় প্রতীকী মুহূর্ত। আর না থাকলেও অভিনন্দন বার্তা ও সরাসরি যোগাযোগ ইঙ্গিত দেয়- দুই দেশই সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে আগ্রহী।
ঢাকার নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা- কিভাবে প্রতিবেশী শক্তির সাথে ভারসাম্য রেখে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা যায়। শপথমঞ্চে কারা থাকবেন, সেটিই হয়তো সেই কূটনৈতিক ভবিষ্যতের প্রথম দৃশ্যপট।



