নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, নদীদূষণ এখন দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বলেন, নদীদূষণ রোধে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই। কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন’ শীর্ষক এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ কথা জানান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ রোধে দ্রুত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। এ সময় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এবং রাজধানীসংলগ্ন অন্যান্য নদীর বর্তমান পরিবেশগত অবস্থা, দূষণের উৎস, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে বৈঠকে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে নিঃসরণ, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খালগুলোর নাব্যতা হ্রাস এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে নদীদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এ ছাড়া বৈঠকে নদীদূষণ রোধে শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করা, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিদ্যমান পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
সভায় পরিবেশ অধিদফতর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী এ কার্যক্রমে পরিবেশবাদী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দেন।
এদিকে বৈঠকে রাজধানীর চারপাশের নদীদূষণ রোধে একটি সমন্বিত ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয় এবং নির্ধারিত সময় অন্তর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে জানান উপ-প্রেস সচিব।
বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, ঢাকা নৌ এলাকার কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ-আল-মাকসুস, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নদী ও খালেরপাড় সুরক্ষা : নদী ও খালেরপাড় সুরক্ষায় করণীয় ঠিক করতে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে নদী ও খালেরপাড় রক্ষায় বিন্না ঘাসের ব্যবহার বিষয়ক এক সভা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের নদী ও খালপাড়ের ভাঙন রোধ, উপকূলীয় বাঁধ সংরক্ষণ, চরাঞ্চল ও হাওরের সড়ক এবং সড়ক ও রেললাইনের পাশে কংক্রিটের ব্লক ও জিও ব্লকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিন্না ঘাস ব্যবহারের ওপর একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ শরিফুল ইসলাম।
উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, নদী ও খালপাড়ের ক্ষয়রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমাধান হতে পারে। দেশের কয়েকটি স্থানে এই ঘাস পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বৃহত্তর পরিসরে প্রকল্প আকারে বাস্তবায়নের বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় এই ধরনের বিকল্প ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনার কথা জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অফিস।
বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বপ্নপূরণ অনুশ্রীর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে স্বপ্নপূরণ হলো রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী অনুশ্রী রায়ের। জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার পূর্ব নবনিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রতিযোগিতায় দেশের গানে প্রথম এবং নজরুল সঙ্গীতে তৃতীয় স্থান লাভ করে অনুশ্রী। গতকাল সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাবা-মাকে সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে অনুশ্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি হারমোনিয়াম উপহার দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ এ কথা জানান।
তিনি জানান, গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে পদক গ্রহণের সময় অনুশ্রী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তার একজন কর্মকর্তার হাতে একটি চিঠি তুলে দেয়। চিঠিতে খুদে এই শিক্ষার্থী সঙ্গীতচর্চার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে। একই সাথে সঙ্গীতচর্চায় সহযোগিতার জন্য একটি হারমোনিয়াম ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার ইচ্ছার কথাও জানায়। পরে প্রধানমন্ত্রী চিঠিটি পড়ে অনুশ্রী ও তার পরিবারকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে আনন্দে আত্মহারা খুদে সঙ্গীতশিল্পী অনুশ্রী জানায়, কখনো বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, আমার চিঠি প্রধানমন্ত্রী পড়বেন এবং সাক্ষাতের জন্য ডাকবেন।
নিরাপত্তা প্রহরীর সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জানান, একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন তাবিউল ইসলাম রাকিব নামে এক নিরাপত্তাকর্মী। রাকিব রাজধানীর কুড়িল-বিশ্বরোড এলাকায় একটি বেসরকারি ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করেন।
রাকিব জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারের ভক্ত। তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। সেই আকাক্সক্ষার কথা জানিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। অবশেষে সেই ইচ্ছা পূরণ হওয়ায় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকালে রাকিব প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার এলাকার মোড়েলগঞ্জের পানগুছি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানান।
আইনমন্ত্রী মাহবুব আলী খান স্মরণে দোয়া মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ
সাবেক নৌ প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের রূহের মাগফেরাত কামনায় অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রাতে ধানমন্ডির ‘মাহবুব ভবনে’ এই দোয়া মাহফিল হয়। কয়েকজন ইসলামী চিন্তাবিদ বক্তব্য রাখেন।
দোয়া মাহফিলে মাহবুব আলী খানের সহধর্মিণী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু, তার দুই মেয়ে শাহিনা খান জামান, জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, মরহুম মাহবুব আলী খানের বড় মেয়ের স্বামী সৈয়দ শফিউজ্জামানসহ আত্মীয়স্বজনরা শরিক হন।
এই দোয়া অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, মিজানুর রহমান মিনু, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, সংসদ সদস্যরা, সামরিক বাহিনী ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিএনপির ও অঙ্গসংগঠরের নেতারা অংশ নেন।
এর আগে সকালে বনানী সামরিক কবরস্থানে মরহুমের কবর জিয়ারত করেন তার পরিবারের সদস্যরা। পরে নৌ বাহিনীসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মরহুমের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়।



