ইসলামপুরে প্রাথমিক শিক্ষার করুণ দশা

খাদেমুল বাবুল, জামালপুর
Printed Edition
ইসলামপুরের একটি প্রাথমিক স্কুলের শ্রেণী কক্ষের চিত্র : নয়া দিগন্ত
ইসলামপুরের একটি প্রাথমিক স্কুলের শ্রেণী কক্ষের চিত্র : নয়া দিগন্ত
  • ১২৮ প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক নেই
  • ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী

শিক্ষকসঙ্কট, চরম দায়িত্বহীনতা এবং কর্ম ফাঁকির কারণে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। উপজেলার ১২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের ৫৬টি এবং সহকারী শিক্ষা অফিসারের চারটি পদ শূন্য রয়েছে। প্রশাসনিক নজরদারির অভাব ও শিক্ষকদের অবহেলায় ক্রমেই বাড়ছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার।

সম্প্রতি সরেজমিন উপজেলার বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে এমন উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। ২৮ জুলাই বেলা দুইটার দিকে গাইবান্ধা ইউনিয়নের মালপাড়া শহীদ খবির উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তিনজন শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র চারজন। অথচ হাজিরা খাতায় ১০ জনের উপস্থিতি দেখানো হয়। উপস্থিত শিক্ষকেরা জানান, ‘ফিডিং প্রোগ্রাম’ না থাকায় টিফিনের পর শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যায়। এ ছাড়া অভিভাবকদের কওমি ও ক্যাডেট মাদরাসার প্রতি ঝুঁকেও পড়ার কথা জানান তারা।

একই দিন বেলা তিনটার দিকে নয়া মালমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত। এর মধ্যে প্রধানশিক্ষক মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী ও ভাতিজার বউও সহকারী শিক্ষক হিসেবে একই স্কুলে আছেন। স্থানীয়রা জানান, মোশাররফ হোসেন পরিবার নিয়ে বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে জামালপুর শহরে থাকেন। অধিকাংশ সময় তিনি স্কুলে অনুপস্থিত থাকেন।

পরদিন ৩০ জুলাই বেলা ২টায় পচাবহলা আলাই পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে চারজন শিক্ষকের দেখা মিললেও শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ছয়জন। হাজিরা খাতায় ১২ জনের নাম ছিল। টিফিনের পর শিক্ষার্থীরা থাকে না বলে জানান শিক্ষকেরা। আর বেলা আড়াইটায় আলাই পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা থাকলেও সেখানে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী ছিল না। প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

বিদ্যালয় বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ২৯ জুলাই উপজেলা শিক্ষা অফিসার জাহানারা খাতুন জানান, অভিযোগ পেয়ে নয়া মালমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোশাররফ হোসেনকে অফিশিয়ালি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপুরে মোট ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি সরকারি ৭৯টি এবং বাকি ৯৮টি সাবেক রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়, যা তিন ধাপে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এসব স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থী ২১ হাজার৪৭৫ জন এবং সবাই উপবৃত্তির আওতাভুক্ত।

উপজেলায় ৯৩৬টি অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদে ৮৮০ জন কর্মরত এবং ৫৬টি পদ শূন্য। তবে ১৭৭টি প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৪৮ জন। বাকি ১২৮টি স্কুলে ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। সূত্র জানায়, জাতীয়করণ হওয়া ৯৮টি স্কুলের মধ্যে ২৮টি স্কুলের সাবেক রেজিস্টার্ড প্রধান শিক্ষকেরা সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারের পদায়নের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেছেন। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পদোন্নতি আটকে আছে। ফলে ওই ২৮টি স্কুলে তারাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলের স্কুলগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপটে অনেক শিক্ষক ময়মনসিংহ বা জামালপুর থেকে আসা-যাওয়া করেন এবং দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকেন।

সার্বিক বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা খাতুন বলেন, আমার অফিসে জনবলসঙ্কট মারাত্মক। ছয়জন সহকারী শিক্ষা অফিসারের (এটিও) জায়গায় আছেন মাত্র দুজন। এই কম জনবল নিয়ে ১৭৭টি স্কুল নিয়মিত তদারকি করা অসম্ভব। তিনি শিক্ষার মান ফেরাতে সচেতন মহল ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।