সাক্ষাৎকারে রেডিও তেহরানের সাংবাদিক আশরাফুর রহমান

ইরানের মানুষ পারমাণবিক বোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে

ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ চলছে তা সাধারণভাবে আঁচ করা যায় না। তবে ইরানের মানুষ পারমাণবিক বোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
Printed Edition
রেডিও তেহরানের সাংবাদিক আশরাফুর রহমান
রেডিও তেহরানের সাংবাদিক আশরাফুর রহমান |সংগৃহীত

রেডিও তেহরানের বিশ্ব কার্যক্রমের বাংলা বিভাগের সাংবাদিক আশরাফুর রহমান দৈনিক নয়া দিগন্তকে তেহরান থেকে টেলিফোনে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রায় ২২ বছর ইরানের বিশ্ব বিভাগে কাজ করার সময় তেহরানের যে জীবনযাত্রা দেখেছি এখনো সে রকম স্বাভাবিক গতিতেই চলছে, যদিও অনেকেই এই রাজধানী শহর ছেড়ে চলে গেছেন। ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ চলছে তা সাধারণভাবে আঁচ করা যায় না। তবে ইরানের মানুষ পারমাণবিক বোমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। তাদের ধারণা এ বোমা থাকলে বা এ বোমার পরীক্ষা চালানো হলে ইরানে হামলার দুঃসাহস ইহুদিবাদী ইসরাইল ও তার মদদদাতা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব হয়তো দেখাবে না। গতকাল বুধবার নয়া দিগন্তকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আশরাফুর রহমান।

নয়া দিগন্ত : গত শুক্রবার ভোররাত থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরানের সামগ্রিক অবস্থা কেমন?

আশরাফুর রহমান : সামগ্রিকভাবে একটা মিশ্র অবস্থা বিরাজ করছে। কোথাও কোথাও কিছু পরিমানে আতঙ্ক থাকলেও অনেক স্থানে উৎসব উৎসব ভাবের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তেহরানের মানুষ দেখছে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে শায়েস্তা করা হচ্ছে। ইরানের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে এই মুহূর্তে পাল্টা আক্রমণ চালানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ইরানের পাল্টা হামলা চালানোকে জনগণ প্রশংসার চোখে দেখছে। মনে হচ্ছে, ইরানের ইসলামী সরকার ও সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তকে ইরানের মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে ইরানের সব কিছুই স্বাভাবিক। হাটবাজার চলছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু আছে। ব্যাংক খোলা- কাজ চলছে। ইরানের ভেতরে গেলে বোঝা যাবে না যে এটি যুদ্ধকবলিত দেশ। তার পরও তেহরানে তেমন কোনো কাজ নেই এমন অনেকেই নিজ নিজ পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছে, এটি বেশ লক্ষণীয়। এর বাইরে বাংলাদেশীদের যে অবস্থা এই যে তেহরানের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বাংলাদেশীদের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। রেডিও তেহরানের কর্মীদের তালিকা দেয়া হয়েছে, পেশাজীবীদের তালিকা করা হয়েছে। তেহরানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশীদের একটি তালিকা হয়েছে। দূতাবাসে একটি হট লাইন চালু করা হয়েছে। যেকোনো বিপদ-আপদে যোগাযোগ করার জন্য এই লাইন চালু করা হয়। দূতাবাস চাচ্ছে যেসব বাংলাদেশী স্বদেশে ফিরতে চান, তাদের সড়কপথে পাকিস্তান বা তুরস্কে পাঠাবে। সেখান থেকে বিমানযোগে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এভাবে যাওয়ার জন্য এ পর্যন্ত ২৪ জন আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে আমি জানতে পেরেছি। এর মধ্যে কয়েকজন রোগীও আছেন। ইরানে চিকিৎসা নিতে কয়েকজন রোগী বিশেষ করে কিডনি রোগী গেছেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য। তারা দ্রুত দেশে ফিরতে চাচ্ছেন। দুয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

নয়া দিগন্ত : রেডিও তেহরানের কর্মীরা কী নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করছেন?

আশরাফুর রহমান : ইরানের সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি সদর দফতর (তেহরানে কাজ করার সময় শুনেছি, স্থানীয়ভাবে কাচ-ভবন বা সাখতোমানে শিশেই নামে পরিচিত এই ভবন ইরানের সাবেক শাসক রেজা খানের আমলে ইসরাইলি বিশেষজ্ঞরা তৈরি করেছিলেন)-এ ইসরাইল সম্প্রতি হামলা করেছে। পূর্ব ঘোষণা দিয়েই এ হামলা করা হয়েছে। সে সময় পাঁচ বাংলাদেশী সহকর্মী ছিলেন। আমি ওই দিন সকালে পালায় কাজ করে আগেই বাসায় ফিরি। যাই হোক, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশ মোতাবেক আমাদের সহকর্মীরা আইআরআইবির প্রধান প্রবেশ দ্বারের কাছাকাছি আসার পর ইসরাইলি হামলা শুরু হয়। (এই প্রবেশদ্বার ভবন থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।)

নয়া দিগন্ত : বিশ্ব কার্যক্রমের যে ভবনে হামলা হয়েছে, আর সেখান থেকে প্রধান ভবন কত দূরে অবস্থিত?

আশরাফুর রহমান: হামলা কেবল মূল ভবনেই হয়েছে। সেখান থেকে মূল ভবন অন্তত ৩০০ মিটার দূরে হবে। এ হামলার পর বিশ্ব কার্যক্রমের ভবনে কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগের কর্মীরা করোনাকালের মতোই ঘর থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেন।

নয়া দিগন্ত : স্থানীয় লোকজন, গাড়িচালক বা দোকানদারদের সাথে কি আপনার কথা হয়েছে? তারা কী বলছেন বা ভাবছেন?

আশরাফুর রহমান : দুই দিন আগে অফিসে যাওয়ার পথে এক গাড়িচালককে জিজ্ঞাসা করলাম সে কি ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে, নাকি উদ্বেগ দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছে না? সে জবাব দিলো, আমি বরং আগের চেয়ে বেশি ঘুমাচ্ছি। কারণ ইসরাইল বা আমেরিকাকে মোকাবেলা করার সক্ষমতা ইরানের আছে। তাই আমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ঘুমের মধ্যে হামলার শব্দ পাই। তা নিয়েও মাথা ঘামাই না। যদি মরতেই হবে তবে ঘুমের মধ্যে মরে গেলে শান্তিতে মরতে পারব। দোকানে ঘুরেছি। দোকানদার বরং জানতে চেয়েছে তোমার কাছে কেমন লাগছে? জবাবে বলেছি, আমার কাছে তো স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। সেও বলল, সবই স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কারণ বড় আকারের হামলা চালানো মতো সাহস আমেরিকা বা ইসরাইলের হয়তো হবে না। ইরান অনেক বড় দেশ। এ দেশের সব জায়গায় হামলা করতে গেলে বিশাল শক্তি সামর্থ্য দরকার। সেটা ইসরাইলের অন্ততপক্ষে নেই। অন্য দিকে ইসরাইল খুব ছোট জায়গা তাই ইরানের হামলা সফলতা পাচ্ছে। এটি আমাদের আশান্বিত করেছে- দোকানদার এ কথা বলেন।

নয়া দিগন্ত : নিত্যপণ্যের দরদাম বেড়েছে কি? এসবের সরবররাহ কেমন?

আশরাফুর রহমান : সরবরাহ পর্যন্ত। অন্যান্য সময়ের মতোই সব দোকানপাট খোলা। স্বাভাবিকভাবেই বেচাকেনা হচ্ছে। দাম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। অন্যান্য অনেক দেশেই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জিনিসপত্র কেনার হিড়িক পড়ে যায়। ইরানে সে রকমও আমার কাছে মনে হয়নি। দোকানপাটে ভিড় তেমন নেই। সব কিছুই মনে হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে চলছে।

নয়া দিগন্ত : তেহরানের কোন এলাকায় আপনি থাকেন এবং সেখান থেকে কি হামলার বিষয়টি বোঝা যায়?

আশরাফুর রহমান : আমি তেহরানের রাহে আহঙ্গ বা রেলস্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় থাকি। এটি তেহরানের ১১ নম্বর জেলা। আইআরআইবির অফিস থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ স্থান। এলাকাটি মূলত বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে আশপাশে বেশ বড় বড় বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান আছে। আমার বাসা থেকেই হামলাগুলো দেখা যায়। ইসরাইলি ড্রোন যাচ্ছে বা ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা প্রতিহত করছে। প্রথম দিন তিন দফা জানালা থেকে ভিডিও করেছি। প্রথম দিন ইরানের জন্য ভালো ছিল না। অসুবিধার ছিল। কিন্তু এরপর দেখছি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রকে একদম খেয়েই ফেলছে। আমার বাসার আশপাশে যারা আছেন তারা ছাদে ওঠে বা বাইরে বের হয়ে ভিডিও করেন। ইরানিদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই; বরং উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যখন ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে আঘাত বা ধ্বংস করে, তখন ইরানি জনগণ আল্লাহু আকবর ধ্বনি দেয়। উল্লাস প্রকাশ করে। এটি অন্য রকম অনুভূতি।

নয়া দিগন্ত : ইসরাইলি হামলার মুখে ইরানিরা কেউ বাংকারে ছুটে যায় কি?

আশরাফুর রহমান : ইরানের মেট্রোরেল স্টেশন অনেক গভীরে। ৭০ থেকে ১০০ ফুট মাটির নিচে। ইরান সরকার ঘোষণা করেছে ইসরাইলি হামলার সময় সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন। আর মসজিদে আশ্রয় নেয়ার পরামর্শও দিয়েছে ইরান সরকার। তবে আমার জানা মতে, আমি মেট্রোরেলে যাতায়াত করেছি, লোকজনকে সেখানে আশ্রয় নিতে দেখা যায়নি। কারণ ইসরাইলের হামলা নিয়ে ভীতি তাদের মধ্যে কাজ করছে না। ইসরাইলে সাইরেন বাজলে বা বোমা ফাটলে সেখানকার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র বা বাংকারে ছোটে। ইরানে মানুষ দেখতে বের হয়ে আসে কী হচ্ছে? যুদ্ধ অবরোধ দেখতে দেখতে ইরানিরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এদের মধ্যে সে ভীতি কাজ করছে না।

নয়া দিগন্ত : ইসরাইলের হামলার আগে বা হামলা হলে ইরানে কি সাইরেন বাজে?

আশরাফুর রহমান : না। না। এখানে কোনো সাইরেন বাজতে শুনিনি বা সে রকম ব্যবস্থা আছে বলেও আমি জানি না।

নয়া দিগন্ত : অবরোধ, হুমকি, যুদ্ধ এত সব কিছু এখন ঘটছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। ইরান এ কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলেছে। বোমা বানানোর জন্য নয় বলে বারবার বলেছে। এখন ইসরাইলের হামলার পর ইরানের মানুষ কি মনে করে, ইরানের পরমাণু বোমা থাকা উচিত?

আশরাফুর রহমান : হ্যাঁ ইরানের লোকজন মনে করেন তাদের পরমাণু বোমা থাকা উচিত। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন তাদের দেশের বোমা বানানোর মতো প্রস্তুতি আছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা থেকে সবাই বলেন, ইচ্ছা করলেই ইরান পরমাণু বোমা বানাতে পারে। জনগণ এ কথায় আশ্বস্ত বোধ করছেন। কিন্তু পরমাণু বোমা বানানো বা মজুদ করা যাবে না বলে সর্বোচ্চ নেতার ফতোয়া থাকায় ইরানিরা এ বিষয়ে তেমন মাথা হয়তো ঘামান না। তবে ইরানের মানুষ পরমাণু বোমার প্রয়োজন অনুভব করে। পাশাপাশি তারা এটাও অনুভব করে যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দিয়ে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। পারবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।

শেষে আশারাফ বলেন, মুসলিম বিশ্বে ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে পুরোপুরি নেতৃত্ব দিচ্ছে ইরান। হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান। আমার মনে হয় ইরান এখন যে অভিযান চালাচ্ছে, তাতে গোটা মুসলিম বিশ্বের সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। কারণ ইসরাইলকে শায়েস্তা করার জন্য এটিই উপযুক্ত সময়। এ সময় ইরানের সাথে একটি প্রতিরোধ অক্ষ গড়ে তুলতে পারলে ইসরাইল পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর যদি ইরান কোনোভাবে পরাজিত হয় বা তারা ইরানের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয় তা হলে মুসলিম বিশ্ব পুরোপুরি মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে। তখন দেখা যাবে ইসরাইল-আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের ওপর ইচ্ছেমতো ছড়ি ঘোরাবে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো কেউ আর থাকবে না। তাই আমি মনে করি গোটা বিশ্বের মুসলমানদের এই সময়ে ইরানের পাশে এসে যুদ্ধ করা উচিত।