পুরনো অনিয়ম রোধে নতুন প্রজ্ঞাপন

শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা নয়ছয় ভুয়া ইনডেক্সে অর্থ লেনদেনের তথ্য

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষকরা তাদের পাওনা টাকাও তুলতে পারছেন না। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিগত আওয়ামী আমলে ভুয়া ইনডেক্স খুলে বিশাল অঙ্কের টাকা নয়ছয় করেছে একটি চক্র। তারা দুর্বল ব্যাংকে শিক্ষকদের সঞ্চয়ের টাকা রেখে অতিরিক্ত মুনাফা ভোগ করেছে। অথচ অবসরে যাওয়া অনেক শিক্ষক অস্্ুস্থ অবস্থায় আবেদন করেও নিজের টাকা পাননি বছরের পর বছর। অনেক শিক্ষক টাকা না পেয়ে চিকিৎসা করাতে না পেরে মৃত্যুবরণও করেছেন।

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান করে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী অনেক কর্মকর্তার এ অনিয়মে সস্পৃক্ত থাকার বিষয়ে তথ্য প্রমাণও পেয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো শিক্ষক অবসরের পর এভাবে কল্যাণ ফান্ডের কিংবা অবসর ভাতার আবেদন করে টাকা না পেয়ে কষ্টভোগ করতে না হয় সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, অতীতের অনিয়ম দূর করতেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশে স্থায়ী পদধারী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচালককে পরিষদের সদস্যসচিব করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগের কিছু সংজ্ঞায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ দু’টিতে ২১ জন সদস্য বহাল রেখে নতুন চারজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশের নাম বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড অধ্যাদেশ, ২০২৬ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট অধ্যাদেশ, ২০২৬। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা দেয়ার জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট সৃষ্টি করা হয়। অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট পৃথক দু’টি পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা পরিচালিত হয়।

সূত্র আরো জানায়, পচিালনা পর্ষদ কর্তৃক ইতঃপূর্বে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের আইন লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠান দু’টির স্থায়ী তহবিলের টাকা জাতীয়করণকৃত ব্যাংকে জমা না করে বেসরকারি দুর্বল ব্যাংকে জমা রাখা, ভুয়া ইনডেক্স সৃষ্টি, একই ইনডেক্সের বিপরীতে একাধিকবার অবসর সুবিধা দেয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়। এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক বিশেষ নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অনিয়ম চিহ্নিত করার পাশাপাশি বোর্ডের আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে অস্থায়ী পদধারীর পরিবর্তে একজন স্থায়ী পদধারী কর্মকর্তাকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষমতা ন্যস্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর প্রেক্ষিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে স্থায়ী পদধারী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচালককে পরিষদের সদস্যসচিব করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ দু’টিতে বিদ্যমান ২১ জন সদস্য বহাল রেখে নতুন চারজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা যিনি এ বিভাগের কর্তৃক মনোনীত হবে। অবসর সুবিধা বোর্ড, কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক যিনি তার সদস্যসচিবও হবেন।

চলতি জানুয়ারি মাস থেকেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অফিস নতুন ঠিকানায় চলে গেছে। অফিস স্থানান্তর এবং ভাড়াচুক্তি সম্পাদনের অনুমতিও দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ প্রতিষ্ঠান দু’টির কার্যক্রম রাজধানীর রমনার ইস্কাটন গার্ডেন রোডের রেড ক্রিসেন্ট বোরাক টাওয়ার ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। একই ভবনের চারতলায় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কার্যালয় রয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। চিঠিটি সুবিধা বোর্ডের পরিচালক ও কল্যাণ ট্রাস্টের সচিবকে পাঠানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। চিঠিতে বলা হয়, ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের নির্ধারিত হারে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্টের অফিসের জন্য বাড়ি ভাড়ার জন্য অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য বরাদ্দকৃত ভবনে অনুমোদিত স্পেসে অফিস স্থানান্তর এবং ভাড়ার চুক্তিপত্র সম্পাদনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর আগে রাজধানীর নীলক্ষেতের ব্যানবেইস ভবন থেকে এ প্রতিষ্ঠান দু’টি সরানো হয়। ব্যানবেইসের ভবনে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অবসরে যাওয়া সিনিয়র শিক্ষকদের বসার তেমন জায়গা নেই। তা ছাড়া ভবনটি ব্যানবেইসের। সেখানে ভাড়া করে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট। সার্বিক দিক বিবেচনায় তাদের কার্যক্রম নীলক্ষেত থেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।