জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়তি চাপে মধ্য ও নিম্নবিত্ত, জীবনযাত্রার ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী

শাহ আলম নূর
Printed Edition
জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পের সামনের সড়কে দীর্ঘ অপেক্ষা। রাজধানীর আসাদগেট এলাকার দৃশ্য : নয়া দিগন্ত
জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পের সামনের সড়কে দীর্ঘ অপেক্ষা। রাজধানীর আসাদগেট এলাকার দৃশ্য : নয়া দিগন্ত

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের পরপরই এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বগতি, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল তাৎক্ষণিক ব্যয় বাড়াবে না, বরং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার একদিনের মধ্যেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজিতে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৯৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসেই দু’বার এলপিজির দাম বাড়ানো হলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা লেগেছে পরিবহন খাতে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রাকভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আগে যেখানে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা, তা সাম্প্রতিক সঙ্কটে বেড়ে ২৮-৩০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। নতুন দামের প্রভাবে পরিবহন ব্যয় আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে বগুড়া থেকে ঢাকাগামী পাঁচ টনের ট্রাকভাড়া ১৬-১৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২-৩ হাজার টাকা বেশি দাবি করা হচ্ছে। কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে চাল পরিবহনের ক্ষেত্রেও ট্রাকপ্রতি ভাড়া দেড় হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। পরিবহন মালিকরা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে দৈনিক পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। যাত্রী পরিবহনেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাসভাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে না বাড়লেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোতেও ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দুই ধাপে পড়ে। প্রথম ধাপে পরিবহন খরচ বাড়ে এবং দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে শাকসবজি, পেঁয়াজ, আলুসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কাওরানবাজারে কেজিপ্রতি সবজিতে ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে।

এদিকে কৃষি খাতে এর প্রভাব আরো গভীর। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচব্যয় বেড়ে গেছে, এমন পরিস্থিতিতে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা সেই অনুযায়ী বাজারে ন্যায্যমূল্য পান না, ফলে তাদের লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সিরাজগঞ্জ সদর থানার কৃষক রমজান আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিজেলের দাম বাড়লে জমি চাষ, সেচ ও ফসল পরিবহনের খরচ একসাথে বেড়ে যায়। এতে শেষ পর্যন্ত বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, যার চাপ পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি তাদের দৈনন্দিন জীবনে পড়ছে। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, বাজার খরচ বৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মতিঝিলে কর্মরত বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল হোসেন বলেন, প্রতিবার তেলের দাম বাড়লে অফিসে যাতায়াত খরচ বাড়ে, বাজার খরচ বাড়ে। কিন্তু বেতন তো বাড়ে না। ফলে মাস শেষে সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, অনেক সময় ধার করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী আগে যেখানে দৈনিক যাতায়াতে ১০০ টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ১৩০-১৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে মাসিক খরচ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে ডেলিভারি চার্জ, রেস্টুরেন্টে খাওয়ার খরচ এবং বাসাভাড়াও বাড়তে পারে। তারা বলছেন বাজারে গিয়ে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। একই পরিমাণ পণ্য কিনতে গিয়ে বাড়তি ২০০-৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে শিল্প খাতেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব শিল্প কারখানায় ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হয়, সেখানে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। লোডশেডিং বেড়ে গেলে জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে, যা খরচকে আরো বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ায় ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের মাসিক ব্যয় আরো বৃদ্ধি পাবে।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে। কারণ, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বৃদ্ধি পায়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ বাড়ে। এতে শুধু মধ্যবিত্ত নয়, সব শ্রেণীর মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপের কারণে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তিনি বলেন, উচ্চ দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বাজারমূল্য সব কিছুতেই প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের সঞ্চয় কমে যায়, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট তৈরি হতে পারে এবং বিনিয়োগ কমে গিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট ঠেকানো। একই সাথে পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি জোরদার এবং নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। তারা বলছেন, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা কমানো সম্ভব।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ এবং ভোক্তা পর্যায় সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে বাড়তি এই চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্য ও নি¤œবিত্ত পরিবারগুলো। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরো গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।