বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভায় অর্থমন্ত্রী

এলডিসি উত্তরণে প্রস্তুতি নেই পিছিয়ে দেয়ার আবেদন

Printed Edition
এনইসি সম্মেলন কক্ষে বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভায় বক্তব্য রাখেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : নয়া দিগন্ত
এনইসি সম্মেলন কক্ষে বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভায় বক্তব্য রাখেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

  • করের হার নয়, করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর
  • প্রস্তুতির সময়সীমা তিন বছর বাড়াতে জাতিসঙ্ঘকে অনুরোধ

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এখনো সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর মতো পূর্ণ প্রস্তুতি নেই। এই উত্তরণ প্রক্রিয়া টেকসই ও মসৃণ করতে প্রস্তুতির সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়িয়ে দেয়ার জন্য সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। বৈদেশিক ঋণ, অভ্যন্তরীণ দেনা, উচ্চ সুদের ঝুঁকি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভা শেষে গতকাল সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জাতিসঙ্ঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিজ রাবাব ফাতিমা এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। সভায় দেশের উত্তরণ প্রস্তুতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে জাতিসঙ্ঘের সংস্থা টঘ-ঙঐজখখঝ-এর পক্ষে ড. আবদুর রাজ্জাক ও ড. ড্যানিয়েল গে একটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন উপস্থাপন করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে একটি চাপপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারলেই এলডিসি উত্তরণ নিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করা সম্ভব হবে। তিনি আরো বলেন, জ্বালানি সঙ্কট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘœ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, যা খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার জনগণের ওপর হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। তবে দীর্ঘদিন ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি, যাতে এক দিকে জনগণের স্বার্থ রক্ষা হয় এবং অন্য দিকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রতিদিনের সঙ্কট মোকাবিলা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক সূচক নিম্নমুখী। সরকার অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, তবে আমদানি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজনে উত্তরণ প্রক্রিয়া কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে, যাতে মৌলিক সূচকগুলো শক্তিশালী করা যায়।

সভায় উপস্থাপিত এক স্বাধীন মূল্যায়নে ড. আবদুর রাজ্জাক ও ড. ড্যানিয়েল গে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সঙ্কট, কোভিড-১৯ মহামারি, রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণের সাথে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। তাই উত্তরণ প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি খাতের রূপান্তর এবং লজিস্টিকস উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং করের আওতা বৃদ্ধি করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তিনি বলেন, অতীতে কিছু প্রকল্প যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া গ্রহণ করায় ঋণের চাপ বেড়েছে। তাই নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা এবং বিদ্যমান ঋণের কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি।

তিনি আরো বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক নয়। করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি করে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর, বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।

জাতিসঙ্ঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিজ রাবাব ফাতিমা জানান, সরকার উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরো তিন বছর বাড়ানোর জন্য জাতিসঙ্ঘের কাছে অনুরোধ করেছে। বিষয়টি বর্তমানে ‘এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম’-এর আওতায় বিবেচনাধীন রয়েছে। কারিগরি পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে সুপারিশ করা হবে এবং পরবর্তীতে সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, উত্তরণের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে সরকার মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। আর ইআরডি সচিব মো: শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানান, উত্তরণ প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করতে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।