প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে বৈঠক

অতিরিক্ত সচিবের নিয়োগ বাতিলসহ ৯ দফা দাবি জামায়াতের

Printed Edition
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলের মতবিনিময়  : নয়া দিগন্ত
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

  • এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত বাতিল
  • বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অযোগ্য দাবি

স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া অতিসম্প্রতি সরকার কর্তৃক ইসি সচিবালয়ে বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে চুক্তিভিক্তিক পদায়নকৃত অতিরিক্ত সচিব সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে দলটি। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে বৈঠক শেষে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিবিধান তৈরিতে রাজনৈতিক চাপ ও নির্দেশনার সামনে নির্বাচন কমিশনের নতিস্বীকার করছে। তিনি দাবি করেন, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় সরকার যাদেরকে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দিয়েছে তাদেরকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ, নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতের প্রতিনিধি দলে ছিলেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, সিনিয়র আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দীন সরকার এবং সিনিয়র আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির। বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধিদল মোট ৯ দফা দাবিসংবলিত একটি চিঠি হস্তান্তর করেন।

বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত বিপুল ক্ষমতার মালিক হলেও তারা সেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার সঠিকভাবে এক্সারসাইজ বা প্রয়োগ করতে পারছে না। কমিশনের অঙ্গভঙ্গি ও কাজের ধারায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তারা মারাত্মক রাজনৈতিক চাপে রয়েছে। চাপের মুখে পড়েই স্বাধীন সিদ্ধান্তের বদলে আজ্ঞাবহ ভূমিকা পালন করছে। এই প্রসঙ্গে তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সরোয়ার আলমের গেজেট ও শপথের দ্রুততার কথা উল্লেখ করে বলেন, আদালতের আদেশের কপি বা বিচারপতির সিগনেচার করা নির্দেশ হাতে আসার আগেই রাজনৈতিক প্রভাবে মাত্র দুই-চার ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে গেজেট জারি ও শপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি কমিশনের চরম অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক চাপের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রমাণ দেয়।

তিনি বলেন, ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। তিনি বলেন, ইলেকশন কমিশন একটি কনস্টিটিউশনাল বডি। এখানে কোনো পলিটিক্যাল ব্যক্তির নিয়োগ যেকোনো নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে অন্তরায় এবং বাধা। সামসুল আলম বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিনিয়র নেতা এবং নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, সাংবিধানিক বডিতে অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার কারণ হলো তিনি যেন আজ্ঞাবহ থেকে সরকারি দলের লোকদেরকে নির্বাচনে বিজয়ী করে আনার কাজটি করতে পারেন। এটিই তার এক বছরের জন্য অ্যানইনমেন্ট দেয়া হয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ

নির্বাচন কমিশন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার যে সুপারিশ করেছে, তার তীব্র বিরোধিতা করেছে জামায়াত। তারা এই সুপারিশকে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। জামায়াত বলছে, প্রায় ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন, যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮ এ বর্ণিত সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমরা মনে করি, প্রস্তাবিত বিধানটি পুনর্বিবেচনা করে প্রত্যাহার বা সংশোধন করা প্রয়োজন; যাতে যোগ্য নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার অক্ষুণœ থাকে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, যে রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সরকারের নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেই দলের পদধারী ব্যক্তিরা যাতে কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য তাদের অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ বা বিভিন্ন সংস্থায় যাদের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবি জানানো হয়েছে। জামায়াতের যুক্তি হলো, এসব পদে থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচন করলে তা কখনো নিরপেক্ষ হবে না।

জামায়াতের দাবি যেহেতু আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা, তাই কোনো সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী যাতে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা বা মিটিং করতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।

ইসির স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষা

সরকারের মন্ত্রীরা যেভাবে নির্বাচনের তারিখ বা তফসিল নিয়ে আগাম মন্তব্য করছেন, তার প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াত বলেছে যে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা একমাত্র ইসির সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ ছাড়া তারা কমিশনকে সরকারি চাপে নতি স্বীকার না করে স্বাধীনভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যক্তির কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত। তিনি বলেন, বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়া বা বহাল থাকার বিষয়টি পুরোপুরি সংসদীয় বিধি, স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত। নির্বাচন কমিশন বিষয়টি গুরুত্বের সাথে শুনেছে এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

একই সাথে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের পারিবারিক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার বাড়িতে হামলা ও পরিবারকে হেনস্তা করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে গণমাধ্যমকে প্রকৃত সত্য উন্মোচনের আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।