দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে ধীরগতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি সংস্থাগুলো বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বললেও বাস্তবে নতুন শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উচ্চ সুদের হার, ডলার সঙ্কট, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার ঘাটতি এসব কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের আস্থায়ও ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করলেও বিনিয়োগে ধীরগতির আভাস পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার কয়েক বছর ধরে প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। পরের বছর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে এরপর আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার প্রায় ২৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমে আসে এবং সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী তা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।
এ দিকে বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহও প্রত্যাশার তুলনায় কম রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে মোট এফডিআই আসে প্রায় ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে। সাম্প্রতিক সময়েও এই প্রবাহ প্রায় একই মাত্রায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও সম্ভাবনার তুলনায় এই পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ খুবই সীমিত। এদিকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ৭১ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এর তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে মোট ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল। এদিকে দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে এফডিআই এর বিবেচনায় বাংলাদেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উৎস দেশ যুক্তরাজ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটি থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। অথচ এ সময়েই যুক্তরাজ্য সফর করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং ব্রিটিশ সরকার ও শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর সাথে বৈঠক করেন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কোরিয়া ও তুরস্কসহ যেসব দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকারি সফর হয়েছে, সেসব দেশ থেকেও গত অর্থবছরে বিনিয়োগ কমেছে। চীন থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনিয়োগ আসার চেয়ে বেশি অর্থ প্রত্যাবাসিত হয়েছে, কোরিয়া থেকে নিট এফডিআই কমেছে ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং তুরস্ক থেকে কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) নয়া দিগন্তকে বলেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারও নতুন বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগেও শিল্পঋণের সুদের হার প্রায় ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ক্ষেত্রে তা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ করতে হলে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে এই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন বিনিয়োগ মানে নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে বিনিয়োগে এক ধরনের ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লষনে দেখা যায়, দেশে বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) কিছুটা বাড়ার লক্ষণ দেখা গেলেও নতুন দেশীয় বিনিয়োগের প্রবণতা আগের মতো শক্তিশালী নয়। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে এবং বিদ্যমান প্রকল্পে পুনঃবিনিয়োগও হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা এবং বিনিয়োগের আকার এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
এ দিকে বিডার কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে তারা আশা করছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য। শ্রমশক্তি, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং রফতানি সম্ভাবনার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা করছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, বাস্তবে বিনিয়োগের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি অনুকূল নয়। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার নতুন বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগেও শিল্পঋণের সুদের হার তুলনামূলক কম ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপনের খরচও অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করছে। এতে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল পুরোপুরি চালু হলে শিল্পখাতে বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অঞ্চলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা জমি বরাদ্দ নিয়েছেন এবং কারখানা স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।



