নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দেশে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ছোঁয়াচে এ ভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরো ৮৮৬ জন। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের বুলেটিনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরো ১৮৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এ পর্যন্ত সারা দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩৪৬ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৩০ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯১, চট্টগ্রামে ৬৩, বরিশালে ৪৭, ময়মনসিংহে ৭২, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে ২৪ ঘণ্টায় আরো ৯৭২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৮৮৬ জন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮৪ জন, রাজশাহীতে ৩০, সিলেটে ১১৯, চট্টগ্রামে ২৫৪, বরিশালে ৭১, ময়মনসিংহে ৪৮, খুলনায় ৭০, রংপুরে ১০ জন।
এ নিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ২২ হাজার ৭৯৪। তাদের মধ্যে এক লাখ ১৮ হাজার ৫৪০ জন হাসপাতাল ছেড়েছে। আর দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৮। আর নিশ্চিত হাম রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৭৩০ জনে।
সিলেটে ভয়ালরূপে হাম
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত সাত দিনে হাম ও উপসর্গে মারা গেছেন ১১ জন। মৃতদের মধ্যে ১০ জনই শিশু। অপরজন ১৮ বছর বয়সী এক নারী। ৭ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের সাত দিনের তথ্য পর্যালোচনায় এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এ সময়ে শুধু ৮ আগস্ট কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বাকি ছয় দিনেই একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও উপসর্গে ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১৪ জনে। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৬ জন।
বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা: মো: মাহবুবুল আলম।
স্বাস্থ্য বিভাগের গত সাত দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭ আগস্ট মারা যান দুইজন। পর দিন ৮ আগস্ট কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এরপর ৯ আগস্ট পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে- এ দিন তিন জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী এক নারী। এরপর ১০ আগস্ট দুইজন, ১১ আগস্ট একজন, ১২ আগস্ট দুইজন এবং সর্বশেষ ১৩ আগস্ট আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
অর্থাৎ ৭ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জন শিশু হওয়ায় হাম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৩ আগস্ট মারা যায় হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের দুই বছর বয়সী শিশু জেসি। হবিগঞ্জের ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম ও উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ৯৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১৪ জনে। এর মধ্যে সিলেটে ২৯৮, হবিগঞ্জে ১৩০, মৌলভীবাজারে ১৩৩ এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৩ জন রয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৬ জন।
সুনামগঞ্জে মৃত্যু ও আক্রান্ত বেশি
জেলাভিত্তিক হিসাবে চলতি বছরে হাম ও উপসর্গে সিলেটে ৪৭, হবিগঞ্জে ১৭, মৌলভীবাজারে ১৩ এবং সুনামগঞ্জে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর দিক থেকে সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে।
নিশ্চিত হাম শনাক্তের দিক থেকেও সুনামগঞ্জ এগিয়ে। জেলাটিতে এ পর্যন্ত ৩৫৩ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এরপর সিলেটে ২৯৮, মৌলভীবাজারে ১৩৩ এবং হবিগঞ্জে ১৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
১৩১ মৃত্যুর ১২৫ জনই উপসর্গ নিয়ে
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর হাম ও উপসর্গে মারা যাওয়া ১৩১ জনের মধ্যে নিশ্চিত হাম ছিল ছয় জনের। বাকি ১২৫ জন মারা গেছেন হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সাত দিনের মৃত্যুর বড় অংশই শিশু। এক সপ্তাহে ১১ জনের মৃত্যু এবং তাদের মধ্যে ১০ জন শিশু হওয়ায় সিলেটে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরো জোরালো হয়ে উঠেছে।
প্রতিদিন নতুন করে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত, হাসপাতালে প্রায় তিনশ রোগীর চিকিৎসাধীন থাকা এবং ধারাবাহিকভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সিলেটের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।


