আসাদুল ইসলাম সবুজ লালমনিরহাট ও
মো: রেজোয়ান ইসলাম ডিমলা (নীলফামারী)
উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারতে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এতে লালমনিরহাট ও নীলফামারীর নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শত শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে এবং হাজারো বাড়িঘর, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি ৫২ দশমিক ১৬ মিটার রেকর্ড করা হয়, যা বিপদসীমা (৫২ দশমিক ১৫ মিটার) অতিক্রম করে এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সকাল ৬টায় একই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার নিচে ছিল বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবো ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ভারতের উজানে কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ দ্রুত বেড়েছে। এর প্রভাবে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার তিস্তাপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। ডিমলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী ইউনিয়নের পাশাপাশি জলঢাকার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, প্রায় ১০টি চর ও চরগ্রামের আট হাজার বাড়ি প্লাবনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ দিকে ধান, ভুট্টা ও বাদামসহ বিভিন্ন ফসল এখনো ঘরে তোলা শেষ হয়নি। পানি আরো বাড়লে ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
নদীপাড়ের গোবর্ধন গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, কয়েকদিন ধরে পানি বাড়া-কমা করছিল, তবে মঙ্গলবার পানির উচ্চতা অনেক বেড়েছে। অনেক বাড়িতে ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে পানিবন্দী অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডিমলার ছোটখাতা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন, রাত থেকেই নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। নদীর তীব্র স্রোত ও গর্জনে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বসতভিটা রক্ষা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা।
পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান জানান, অনেক কৃষক মাছের ঘের জাল দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করছেন। অনেকে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, শুষ্ক মৌসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয় না। বর্ষা মৌসুমে জরুরি মেরামতের নামে কাজ করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয় না। এতে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকেই যায়।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, উজানের পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকায় নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে হালকা বন্যা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, উজানে ভারী বর্ষণের কারণে পানির চাপ দ্রুত বাড়ছে। অতিরিক্ত পানি নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে।



