গর্ভবতী, অসুস্থ স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী হাফেজ নূরে আলম সিদ্দিকী রাকিব। পরিবারের কাছে সেটি ছিল একেবারে সাধারণ একটি সকাল। কিন্তু ২০২৪ সালের ২০ জুলাইয়ের সেই সকালই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিন। হাতে ওষুধ নয়, কয়েক ঘণ্টা পর তিনি ফিরেছিলেন নিথর দেহ হয়ে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া বাজারে সে দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ চলছিল। ঘটনাস্থলের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন সদ্য বিবাহিত এই তরুণ হাফেজ। ঠিক সেই সময় একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার বুকে। ঘটনাস্থলেই শেষ হয়ে যায় তার জীবন, থেমে যায় একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।
শহীদ হওয়ার সময় তার স্ত্রী সাদিয়া আক্তার ছিলেন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস পর, ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্ম নেয় তাদের একমাত্র কন্যা সাবরিনা বিনতে সিদ্দিকা। পৃথিবীতে আসার আগেই যে শিশুটি হারিয়েছে তার বাবাকে।
এখন সাবরিনা হামাগুড়ি দেয়, খেলনা নিয়ে খেলে, আধো আধো কণ্ঠে বারবার বলে, ‘বাবা... আব্বা...।’ কিন্তু সেই ডাকের কোনো উত্তর নেই। যে বাবা তাকে কোলে নেয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি আজ কেবল স্মৃতির অংশ।
স্ত্রী সাদিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলাম। তাই রাকিব আমার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়েছিল। বাজারে তখন সংঘর্ষ চলছিল। সে মোবাইলে ভিডিও করছিল। হঠাৎ গুলি এসে তার বুকে লাগে। ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। এখন মেয়ের মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনলেই নিজেকে সামলাতে পারি না। রাকিব সংসার গুছিয়ে নেয়ার, সন্তানকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখত। একটি গুলিই সব শেষ করে দিলো।’ ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পুনাইল গ্রামের সাদিয়া আক্তারের সাথে বিয়ে হয়েছিল রাকিবের।
মায়ের শেষ দেখা হয়নি ছেলের মুখ
রাকিব নিহত হওয়ার খবর শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তার মা নুরুন নাহার (৫৬)। তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। রাত ১০টার দিকে বাড়ি ফিরে জানতে পারেন, একমাত্র ছেলেকে ইতোমধ্যে দাফন করা হয়েছে। শেষবারের মতো ছেলের মুখটিও দেখতে পারেননি তিনি।
রাকিবের বাবা আবদুল হালিম (৬২) গৌরীপুরের দাওগাঁও তালিমুল কুরআন মহিলা মাদরাসার শিক্ষক ও পরিচালক। চার সন্তানের মধ্যে রাকিবই ছিলেন একমাত্র ছেলে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার সব স্বপ্ন ছিল রাকিবকে ঘিরে। খুব সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করত, ইসলামী সঙ্গীত গাইত, ভিডিও তৈরি করত। আমি তাকে হাফেজ বানিয়েছিলাম এই আশায়, একদিন সে-ই আমার জানাজা পড়াবে; কিন্তু নিয়তি সবকিছু উল্টে দিলো। শেষ পর্যন্ত আমাকে নিজের সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নাতনীকে কোলে নিলে মনে হয় ছেলেকেই ছুঁয়ে আছি। ওর মধ্যে আমি রাকিবের গন্ধ খুঁজে পাই। এখন শুধু একটি চাওয়া- ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।’
স্বামীর স্মৃতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
স্বামীকে হারিয়ে এখন বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন সাদিয়া আক্তার। কোলে ছোট্ট সাবরিনা। নেই স্বামী, নেই স্থায়ী আয়ের উৎস। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও মেয়েকে নিয়েই বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সাবরিনার মামা শামীম আহমেদ বলেন, ‘আমার ভগ্নিপতি আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। তার সন্তান যেন কোনো বৈষম্যের শিকার না হয়। রাষ্ট্র যেন তার প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে যখন শহীদদের স্মরণ করছে দেশ, তখন গৌরীপুরের দামগাঁও ও ঈশ্বরগঞ্জের পুনাইল গ্রামের দুই প্রান্তকে অদৃশ্য এক সেতুতে বেঁধে রেখেছে ছোট্ট সাবরিনার একটি শব্দ, ‘বাবা’।
সে জানে না, তার প্রতিটি ডাকের সাথে জড়িয়ে আছে এক অসমাপ্ত স্বপ্ন, এক রক্তাক্ত ইতিহাস এবং একটি পরিবারের সারা জীবনের বেদনা। যে বাবা তার হাত ধরে হাঁটাতে পারেননি, সেই বাবার রক্তে লেখা ইতিহাসের সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়ের নাম আজ, সাবরিনা।



