কলকাতায় বিজেপির বিজয়ে উচ্ছ্বাস পতিত আ’লীগে

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

ভারতের কলকাতার বিধানসভা নির্বাচনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির ভূমিধস বিজয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাসে ভাসছে পতিত আওয়ামী লীগ। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ উচ্ছ্বাসের ধারা বইছে। পতিত দলটির অনেকেই ইনিয়ে বিনিয়ে বিজেপির বিজয়কে কার্যত এদেশে তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে এমনটাই ইঙ্গিত দিতে চাইছেন। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর এদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে কলকাতায় আস্তানা গেড়েছে পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল পর্যায়ের একটি বড় অংশ।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বেশির ভাগই আস্তানা গাড়ার পর ওই এলাকা হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। আর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও পতিত দলটির প্রধান শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করায় ওই এলাকা দলীয় প্রধানের কার্যালয় হিসেবে ধরা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ বিজয়ের জন্য কৌশলের নামে অরাজকতার জন্ম দিতেও পিছপা হয়নি নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। যেটা পতিত আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এমন ‘ভূমিধস’ বিজয় বিশ্লেষণ করলে এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলটির ‘হিংসাত্মক’ রূপ আরো নির্মমভাবে ধরা পড়ছে। নির্বাচিত হওয়ার পরই কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মী এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে বিজেপির নেতাকর্মীরা। সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে, মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আর কলকাতায় বসে পতিত দলটির নেতাকর্মীরা বিজেপির এই ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের নিরলস সমর্থন জোগাচ্ছে।

জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে এবং শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও পতিত দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো সংবলিত ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। শুভেন্দু অধিকারীকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এমন একটি ছবি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোচনায় এসেছে। পতিত সরকারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীও শুভেন্দু অধিকারীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এমন একটি ছবি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা হচ্ছে। যদিও ছবি দু’টি পুরনো বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাথে পতিত আওয়ামী লীগের সম্পর্কের টানাপড়েন ছিল। গেল বিধান সভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির সাথে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে এ বিজয়ে স্বাভাবিকভাবে দলটির সব পর্যায়ের নেতাকর্মী খুবই খুশি এবং রীতিমতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচিত হওয়ায় উচ্ছ্বাসের মাত্রা একটু বেশি। কারণ হিসেবে জানা গেছে, শুভেন্দু অধিকারী বলেন- শেখ হাসিনা এখনো বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। তিনি শাহজালাল এয়ারপোর্ট দিয়ে আসবেন এবং তাকে স্যালুট দিয়ে গ্রহণ করতে হবে। যদিও এ বক্তব্য বেশ কিছুদিন আগের। তারপরও ওই বক্তব্যের ভিডিওক্লিপ পতিত আওয়ামী লীগের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং প্রচার করছেন। তারা বোঝাতে চাইছেন- আওয়ামী লীগের সাথে বিজেপির সম্পর্ক রয়েছে এবং এই বিজেপি সরকারের চাপে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া দ্রুত ঘটবে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং তাদের লোকজন একটু বেশিই উচ্ছ্বসিত দেখা যাচ্ছে। এতেই বোঝা যায়, তারা হলো বিশ্বাসঘাতক। তারা কখনোই দেশকে ভালোবাসেনি, এদেশের জনগণের জন্য তাদের কোনো দরদ ছিল না। শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য জনগণকে ব্যবহার করেছে মাত্র। ড. মাসুমের মতে, বিজেপি নির্বাচনে জিততে না জিততেই সেখানকার মুসলমানদের ওপর চরমভাবে জুলুম নির্যাতন শুরু করেছে। এতেও পতিত আওয়ামী লীগের লোকজনের মন কাঁদছে না বরং তারা উৎসব পালন করছে। তারা যে পুনর্বাসনের স্বপ্ন নিয়ে বিজেপির এই ন্যক্কারজনক আচরণের সমর্থন দিচ্ছে, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে তাদের সেই স্বপ্ন এদেশের আপামর জনসাধারণ কস্মিনকালেও পূরণ হতে দেবে না। তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শিব্বির আহমদ মনে করেন, বিজেপির সাথে আওয়ামী লীগের একটি মহব্বতের সম্পর্ক আছে, যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি, পালিয়ে গিয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কলকাতায় অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, বিজেপি তাদের দেশে অবৈধ অনুপ্রেশকারী খোঁজে কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে অনেকটা জামাই আদরে রয়েছেন।