গাজা পরিকল্পনা থেকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র বাদে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ ইসরাইলের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • মার্কিন পরিকল্পনা গাজায় স্থিতিশীলতা আনবে না : হামাস
  • ইসরাইলি বোমা হামলায় নিহত ৩
  • চিকিৎসার অভাবে ৯০০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু
  • যুদ্ধবিরতির এক মাস পরও সুড়ঙ্গে আটকা হামাস যোদ্ধারা

জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের আগে ইসরাইল শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে, যাতে প্রস্তাবের খসড়া থেকে ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উল্লেখ সরিয়ে দেয়া হয়। ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার দীর্ঘ দিন ধরে এ ধরনের ভাষার বিরোধিতা করে আসছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের।

ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারক কান জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর সহযোগী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টিম এবং কয়েকটি আরব দেশের সাথে নিবিড় আলোচনায় রয়েছেন। তাদের লক্ষ্য হলো প্রস্তাবের ভাষা নরম করা বা পুরোপুরি বাদ দেয়া, যেখানে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা’র কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্র প্রণীত এবং এতে গাজায় যুদ্ধবিরতির পর বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে সর্বশেষ সংস্করণে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসরাইল দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভায় বলেছেন, ‘যে কোনো ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরোধিতায় আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত।’

রাশিয়া এ প্রস্তাবের পাল্টা খসড়া দিয়েছে, যেখানে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি পরিষদের অটল প্রতিশ্রুতি জানাতে বলা হয়েছে। মস্কো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাবের সমর্থন আদায়ে প্রচারণা জোরদার করেছে। তারা জানিয়েছে, কাতার, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, জর্দান ও তুরস্কসহ কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশ প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়েছে। কূটনীতিকরা বলছেন, রাশিয়ার সমালোচনা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে চীন ও রাশিয়া বিরত থাকতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বাস্তবায়নে সংগ্রাম করতে দেখতে পারে।

নিরাপত্তা পরিষদে নিউ ইয়র্কের স্থানীয সময় সোমবার যে খসড়া প্রস্তাবটি তোলার কথা রয়েছে, তা ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পরবর্তী ধাপকে এগিয়ে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রস্তাবে বিধ্বস্ত গাজায় একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে। তবে সর্বশেষ খসড়ায় ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ থাকায় নেতানিয়াহু সরকার এর তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানান, যে কোনো ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। এক্ষেত্রে তিনি কারো কোনো স্বীকৃতি, টুইট বা বক্তৃতার আবশ্যকতা বোধ করেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা গাজায় স্থিতিশীলতা আনবে না : হামাস

যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবের সংশোধনী ও ধারাগুলো গাজায় স্থিতিশীলতা আনবে না বলে জানিয়েছেন হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে কাসেম বলেন, ‘জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবের সংশোধনী ও ধারা গাজার পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে না। আমরা চাই এমন একটি প্রস্তাব, যা আমাদের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষা করবে এবং গাজায় যুদ্ধ ঠেকাবে।’ মিডল ইস্ট মনিটর।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই এমন একটি প্রস্তাব, যা দখলদারকে গাজা, পশ্চিম তীর বা জেরুসালেম দখল করা থেকে বিরত রাখবে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কিছু পক্ষকে খুশি করতে অঙ্গীকারহীন ভাষা ব্যবহার করছে। এর বিকল্প হলো এমন একটি প্রস্তাব, যা যুদ্ধবিরতি জোরদার করবে এবং গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রতিষ্ঠা করবে।’ জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ সোমবার নিউ ইয়র্ক সময় বিকেল ৫টায় বৈঠকে বসবে। সেখানে গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত প্রস্তাবে ভোট হবে।

ইসরাইলি রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ভেটো ব্যবহার করবে না। বরং তারা ভোটে বিরত থাকতে পারে বা অনুপস্থিত থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও মিশরের মধ্যে খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে গাজার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমান প্রস্তাবটি দশটি ধারায় গঠিত, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশদ ২০ দফা পরিকল্পনার ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করা হয়েছে।

চিকিৎসার অভাবে ৯০০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাধার কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে না পারায় অন্তত ৯০০ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। লেবানিজ সংবাদমাধ্যম আল মায়েদিনের খবর থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আর ভ্রমণ-অনুমতিতে কঠোর বাধা তৈরি করায় ইসরাইলি অবরোধের মধ্যে পড়ে ৯ শতাধিক ফিলিস্তিনি রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, আরো হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, তারাও জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অনুমতির অপেক্ষায় দিন গুনছে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এখনো প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য গাজা ত্যাগের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় আছেন। তাদের মধ্যে প্রায় চার হাজারই শিশু। যাদের জীবন রক্ষার জন্য দ্রুত বাইরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ডব্লিউএইচও সতর্ক করে বলেছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বিলম্ব কার্যত এসব রোগীর জন্য মৃত্যুদণ্ড।

গাজার হাসপাতালগুলো এখন অর্ধেকের কম সক্ষমতা নিয়ে চলছে। জ্বালানি, ওষুধ আর জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের ভয়াবহ সঙ্কটে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাস থেকে ডব্লিউএইচও মোট ১১৯টি মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন মিশন সম্পন্ন করেছে। এতে প্রায় আট হাজার রোগীকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার শিশু।

ইসরাইলি বোমা হামলায় নিহত ৩

গাজায় ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর হামলায় কমপক্ষে তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। রোববার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলায় ওই তিনজন নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে নাসের মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া একই দিনে ইসরাইল গাজা সিটির জাইতুন এলাকা এবং রাফাহর নিকটবর্তী অঞ্চলেও হামলা চালিয়েছে।

এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় অস্থায়ী তাবুগুলোতে থাকা হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। পাশাপাশি বিদেশী ত্রাণ সাহায্য সরবরাহে ইসরাইলি বাধার কারণে এখনো সঙ্কট আরো তীব্র হয়েছে।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ইব্রাহিম আল খালিলি জানিয়েছেন, ইসরাইলি সেনারা এখনো তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরের এলাকাগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে এ হলুদ রেখা সেনা প্রত্যাহারের সীমারেখা নির্দেশ করলেও তা বারবার লঙ্ঘন করছে ইসরাইলি বাহিনী। ইয়েলো লাইনের কাছে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী একদিকে ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে, অন্যদিকে ভয়-ভীতি ছড়াচ্ছে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসঙ্ঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, গত দুই বছরের নির্বিচার ইসরাইলি হামলায় যাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এমন ১৩ হাজার পরিবার এখন শীত ও বন্যার কারণে চরম দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল এখনো গাজায় তাঁবু ও মোবাইল হোম প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির এক মাস পরও সুড়ঙ্গে আটকা হামাস যোদ্ধারা

এদিকে সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে এ উপত্যকার দক্ষিণের শহর রাফাহর ‘ধ্বংসস্তূপের’ নিচে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। যুদ্ধবিরতির প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রাফাহর বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে আছেন অনেক হামাস যোদ্ধা। সুড়ঙ্গের ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কক্ষে অবস্থান করছেন তারা। কোনোভাবেই যাতে গাজা যুদ্ধবিরতি ভেঙে না পড়ে, সে জন্য একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন মধ্যস্থতাকারীরা। কিন্তু সুড়ঙ্গে আটকা পড়া হামাস যোদ্ধাদের বিষয়টি এ প্রচেষ্টাকে জটিলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

যুদ্ধবিরতির পর গাজা মূলত দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সদস্যদের সরে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সীমারেখা ‘ইয়েলো লাইন’ এর পূর্ব দিকের অঞ্চলগুলো ইসরাইলের দখলে। রাফাহও এ অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। আর পশ্চিমে হামাস আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।

গাজার ইসরাইল-নিয়ন্ত্রিত অংশে আটকে থাকা প্রায় ২০০ হামাস যোদ্ধার ভবিষ্যৎ কী হবে-এ প্রশ্ন এখন আর শুধু সামরিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সঙ্কটে। এর সুস্পষ্ট কোনো সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাস পরও সুড়ঙ্গের ছোট ছোট কক্ষের সঠিক সংখ্যা বা অবস্থান নির্ধারণ করা যায়নি। এ সময়ে হামাস যোদ্ধারা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো নিজেদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত করেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় রাফাহর ‘বন্দী’দের মুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন খবর বারবার অস্বীকার করেছে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে বন্দী মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেননি। এ সংক্রান্ত কোনো সমঝোতাও হয়নি।’