- থমকে আছে শিল্পখাত
- গ্যাস সঙ্কটের বড় প্রভাব পড়ছে নতুন বিনিয়োগেও
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ক্রমেই থমকে যাচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা মেশিন বন্ধ থাকছে, কোথাও দিনের বড় একটি সময় উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না, আবার কোথাও পুরো কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, স্টিল, গ্লাস, কাগজ ও খাদ্যপণ্যসহ গ্যাসনির্ভর প্রায় সব শিল্পেই এখন একই চিত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রফতানি, কর্মসংস্থান ও সরবরাহ ব্যবস্থায়।
সাম্প্রতিক শিল্পখাতের তথ্যে দেখা যায়, জ্বালানিসঙ্কট এখন শুধু ‘গ্যাসের ঘাটতি’তে সীমাবদ্ধ নেই। কম চাপের কারণে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অনেক কারখানা নির্ধারিত সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য কারখানার অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৯০০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল গ্যাসসঙ্কটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। সংগঠনটির সদস্য মিলের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৮০০।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) তথ্যে দেখা যায়, বর্তমান জ্বালানি সঙ্কটে দেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় দুই হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি কারখানাগুলো গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতায় চললেও দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় এক হাজার ৭৪ কোটি টাকা।
ডিসিসিআই এর তথ্যে দেখা যায়, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় দুই হাজার ৪২০ এমএমসিএফডিতে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৩৮০ এমএমসিএফডি ঘাটতি রয়েছে। সরবরাহের এই ঘাটতির পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপও মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে গ্যাসলাইনে সরবরাহ থাকলেও অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
এ দিকে শিল্পাঞ্চলভেদে ক্ষতির চিত্র আরো ভয়াবহ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা গ্যাস সঙ্কটে বন্ধ হয়ে গেছে। তারা বলছেন, শুধু এই দুই শিল্পাঞ্চলেই প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি ছোট-বড় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। জেলার শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কখনো শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাচ্ছে। ফলে অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। আর যেগুলো বিকল্প ব্যবস্থায় চালু রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদনও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
এ দিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, জমি ও ভবনের খরচসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় অব্যাহত থাকে। ফলে উৎপাদন না হলেও উদ্যোক্তাদের ব্যয় থেমে থাকে না। এর সাথে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি আরো বাড়ছে। ডিসিসিআইয়ের তথ্য বলছে, এই সঙ্কট উৎপাদন কমানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির ব্যয়, রফতানি আদেশ পূরণে বিলম্ব এবং নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস সঙ্কটকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি এখন সরাসরি জাতীয় উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপর আঘাত করছে। কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার অর্থ শুধু ওই সময়ের উৎপাদন হারানো নয়; কাঁচামাল ব্যবহারের অদক্ষতা, মেশিন পুনরায় চালুর খরচ, শ্রমঘণ্টার অপচয়, অর্ডার বিলম্ব এবং রফতানি বাজারে আস্থার সঙ্কটও তৈরি হয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি সঙ্কটকে এখন আর শুধু সরবরাহের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি শিল্প উৎপাদন, রফতানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
গ্যাস সঙ্কটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে নতুন বিনিয়োগে। ডিসিসিআইয়ের তথ্যে দেখা যায়, প্রায় এক হাজার ৮৫৭টি শিল্পের গ্যাস-সংযোগের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে অগ্রগতি না পাওয়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সঙ্কট শুধু আজকের উৎপাদন ক্ষতি করছে না; আগামী দিনের শিল্প সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের জাতীয় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানও সঙ্কটের গভীরতা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সাধারণত ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত।
এ দিকে জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকা-ের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শুরুতে একটি ইউনিট আংশিক চালু হলেও দিনে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছিল, যা মোট ঘাটতির তুলনায় খুবই সামান্য। এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে গ্যাসের চাপের ওপর। শিল্প উদ্যোক্তাদের হিসাবে, অনেক এলাকায় উৎপাদনের জন্য যেখানে ৮ পিএসআই বা তার বেশি চাপ প্রয়োজন, সেখানে চাপ নেমে এসেছে ২-৩ পিএসআইয়ে। ফলে বয়লার, ডাইং মেশিন, স্টিম সিস্টেম ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হবিগঞ্জেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে ১৭১টি কারখানায় সম্পূর্ণ গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব। গাজীপুরে প্রায় ১৮ শতাংশ কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছে বলেও সাম্প্রতিক শিল্পখাতের তথ্যে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসের কম চাপের সমস্যাটি শুধু উৎপাদন বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও দুর্বল করছে। জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ইউনিটপ্রতি প্রায় ৩৪ টাকা, যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১৪-১৫ টাকা। অর্থাৎ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বিদ্যুৎ খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার বদলে কারখানা বন্ধ রাখাকেই কম ক্ষতির পথ হিসেবে দেখছেন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইলের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা সহজ নয়। ফলে গ্যাস সঙ্কটের খরচ শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তার মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে অথবা সরাসরি লোকসানে ঠেলে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সঙ্কটের আরেকটি দিক হলো গ্যাসের দাম বাড়ার পরও পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়া। ২০২৫ সালে নতুন শিল্প সংযোগের গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করা হয়। ক্যাপটিভ পাওয়ারের জন্য দাম ৩১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা করা হয়। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা বাড়তি দাম দেয়ার পরও যদি প্রয়োজনীয় চাপ না পান, তাহলে তাদের উৎপাদন ব্যয় ও ঝুঁকি দুটিই বাড়ে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পরিকল্পনা। কেবল মাঝে মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক চাপ ও সরবরাহের ন্যূনতম মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পাইপলাইন অবকাঠামো, এলএনজি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, লোপ্রেসারের ক্ষতি এখন আর শুধু কারখানার হিসাবের খাতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। একটি কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে তার সাথে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা, কাঁচামালের ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহকারী, পরিবহন, রফতানি অর্ডার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে ‘প্রতি ঘণ্টা গ্যাস সঙ্কটে কত টাকা ক্ষতি’-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিল্পভিত্তিক নিয়মিত ডেটা প্রকাশ এখন জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু শিল্পাঞ্চলে দৈনিক ক্ষতি ইতোমধ্যে শত শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং কয়েকটি বড় শিল্প মিলিয়ে ক্ষতির অঙ্ক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে প্রকৃত জাতীয় ক্ষতি জানতে হলে ২০৩০টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দৈনিক উৎপাদন, গ্যাসের চাপ, বন্ধ থাকার সময় এবং আর্থিক ক্ষতির তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করে একটি অভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করা প্রয়োজন। সেই ডেটাই শেষ পর্যন্ত দেখাবে, দেশের শিল্পচাকা দিনে কত ঘণ্টা থেমে থাকে এবং প্রতিটি ঘণ্টার নেপথ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির কত কোটি টাকা হারিয়ে যাচ্ছে।



