প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা আলোচনা হবে

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি গুরুত্ব পাবে

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার বিস্তৃত ইস্যুতে আলোচনা হবে। এই আলোচনায় পদ্মা ব্যারেজসহ অন্যান্য ইস্যু থাকতে পারে। চীনের সাথে ১৭টি দলিল সই হবে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দু’টি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল রয়েছে।

অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে জনশক্তি রফতানির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হবে। দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি এমওইউ সই হবে। পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ বিনিময় হতে পারে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের ডায়ালগ পার্টনার এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ওপর আলোকপাত করে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব কথা জানান। জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে আজ রোববার থেকে দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। সেখান থেকে চার দিনের সফরে তিনি চীন যাবেন। মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ২৭ জন এবং চীন সফরে ২৮ জন সফরসঙ্গী থাকবে।

চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিংপিংয়ের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্লোবাল ডেভেলাপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই) এবং গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভকে (জিজিআই) স্বাগত জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, চীনের বৈশ্বিক এই উদ্যোগ এবং প্রেসিডেন্ট শি জিংপিংয়ের নতুন চিন্তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে এই উদ্যোগগুলোর কোনোটিতে যোগ দেয়া বা না দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় নেয়া হবে।

বাংলাদেশে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অর্থায়নের প্রস্তাব সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। বেশ আগে এই মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। আমরা তা পর্যালোচনা করছি। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে আসাদ আলম সিয়াম বলেন, চীনের সাথে বাংলাদেশের জোরালো সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। ইস্যুটি নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে আলাপ হবে। তবে সমরাস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা দুই দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে হয়।

চীনের বিনিয়োগ আকর্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেইজিং সফরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে চীনের ব্যবসায়ী নেতারা সাক্ষাৎ করবেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের অর্থায়নসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে অর্থায়নের পরিমাণ ও খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় না। সেগুলো মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ে আলোচনায় হয়।

আসাদ আল সিয়াম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের আরো কর্মী নেয়ার জন্য আমরা অনুরোধ করব। তবে মালয়েশিয়া বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নয়, সব বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনার মধ্যে রেখেছে। আমরা আশা করি, এই পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশের জনশক্তি অগ্রাধিকার পাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হবে। তবে মালয়েশিয়ার সাথে সম্পর্ককে শুধু শ্রমবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো বিস্তৃত পরিসরে দেখা হবে।

সফরসূচি সম্পর্কে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ রোববার দুপুরে ঢাকা থেকে কুয়ালালাপুর যাচ্ছেন। পরদিন ২২ জুন দুই প্রধামন্ত্রীর মধ্যে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। এতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হবে। মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন সন্ধ্যায় চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৩ জুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সাথে তারেক রহমানের বৈঠক হবে। ডব্লিউইএফের বার্ষিক সভা সামার দাভোসে অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারপ্রধানদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে। ডব্লিউইএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ বিষয়ক একটি অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। ২৪ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রী সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হলো ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কিল’। ওই দিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন। ২৫ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বৈঠক হবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সেখানে রাখা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাবেন। বিকেলে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেবেন তারেক রহমান। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি দলিল সই হবে। তারেক রহমান তার সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন। ২৬ জুন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে। এরপর তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তিয়েন আনমেন স্কয়ারে সেখানকার বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। একই দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন ।