এইচ এম হুমায়ুন কবির কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ৩৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ১৭টির ভবন দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জরাজীর্ণ এসব ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও দরিদ্র রোগীরা। যেকোনো সময় ভবন ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
হাসপাতাল সূত্র ও সরেজমিনে দেখা গেছে, টিয়াখালী ইউনিয়নের চারটি, চাকামইয়া ইউনিয়নের একটি, লালুয়া ইউনিয়নের একটি, বালিয়াতলী ইউনিয়নের একটি, মহিপুর ইউনিয়নের একটি, ধানখালী ইউনিয়নের তিনটি, ধূলাসার ইউনিয়নের একটি, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের দু’টি এবং লতাচাপলী ইউনিয়নের একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনের অবস্থা একেবারেই বেহাল। এর মধ্যে কয়েকটি ভবন প্রায় ২৬ বছর আগে নির্মিত। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় দেয়াল ও ছাদে ফাটল ধরেছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। কোথাও মেঝে দেবে গেছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।
কয়েকটি ক্লিনিকে টয়লেট ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও নেই। রোগীদের বসার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। ছাদের কার্নিশসহ বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। ঝুঁকির কারণে অনেক গর্ভবতী নারী এসব ক্লিনিকে যেতে সাহস পান না। কোথাও কোথাও ভবনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে মূল ক্লিনিকে সেবা দেয়া বন্ধ রেখে বিকল্প স্থানে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
উপজেলার গ্রামীণ জনপদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। কিন্তু ভবনের বেহাল দশার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলছে ওষুধের সঙ্কট। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উপজেলার ৩৭টি ক্লিনিকের অধিকাংশেই প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুদ থাকে না। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি এবং সাধারণ রোগের চিকিৎসাসহ নানা জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে গ্রামীণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য অন্তত ২০ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্লিনিকেই দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলছে না। মাঝেমধ্যে সামান্য কিছু ওষুধ সরবরাহ করা হলেও তা দিয়ে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিতে আসা প্রান্তিক মানুষকে অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়।
অন্ততপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) সাবিহা সুখী বলেন, ক্লিনিকের ছাদের বড় বড় অংশ ভেঙে পড়েছে। রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। অনেক বছর আগে ক্লিনিকটি মেরামত করা হলেও কিছুদিন পর আবার জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে।
পূর্ব মধুখালী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি ইসরাত জাহান বলেন, ক্লিনিকের ভবনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে পাশের ইউনিয়ন পরিষদে বসে সেবা দিতে হচ্ছে। এতে পল্লী এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।
পূর্ব মধুখালী এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি প্রাথমিকভাবে ভালো সেবা দেন। কিন্তু ক্লিনিকের ভবনগুলোর এমন অবস্থা যে মনে হয় এগুলো নিজেরাই ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে। জরাজীর্ণ ক্লিনিকগুলো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা দরকার।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: তেন মং বলেন, যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ওষুধ সঙ্কটের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, এ নিয়ে নানা সমস্যা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার সরকারি উদ্যোগই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়বে।


