রোকেয়া বেগমের নিঃসঙ্গ লড়াই ও এক বিপন্ন জীবনের আখ্যান

‘৭১ সালে আব্বা-আম্মার যুদ্ধে গিয়ে মারা যাওয়া ঠিক হয় নাই’

‘৭১ সালে আমার আব্বা-আম্মার যুদ্ধে গিয়ে মারা যাওয়া ঠিক হয় নাই।’ রাজধানীর বড় মগবাজারের ধুলোবালিমাখা পথে দাঁড়িয়ে যখন কথাটি বলছিলেন রোকেয়া বেগম, তখন তার কণ্ঠে কোনো রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছিল না। ছিল না কোনো আদর্শিক লড়াইয়ের ছাপ। ছিল কেবল দীর্ঘ এক জীবনের পুঞ্জীভূত কষ্ট আর মা-বাবার স্নেহের জন্য তৃষ্ণার্ত হাহাকার।

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

‘৭১ সালে আমার আব্বা-আম্মার যুদ্ধে গিয়ে মারা যাওয়া ঠিক হয় নাই।’ রাজধানীর বড় মগবাজারের ধুলোবালিমাখা পথে দাঁড়িয়ে যখন কথাটি বলছিলেন রোকেয়া বেগম, তখন তার কণ্ঠে কোনো রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছিল না। ছিল না কোনো আদর্শিক লড়াইয়ের ছাপ। ছিল কেবল দীর্ঘ এক জীবনের পুঞ্জীভূত কষ্ট আর মা-বাবার স্নেহের জন্য তৃষ্ণার্ত হাহাকার। পাঁচ-ছয় বছর বয়সে এতিম হওয়া এক শিশুর কাছে যুদ্ধ মানে কোনো মানচিত্র বদল নয়, যুদ্ধ মানে মাথার ওপর থেকে অভিভাবকের ছায়া সরে যাওয়া। সেই শূন্যতা বয়ে নিয়ে আজও তিনি পথ চলছেন।

রোকেয়া বেগমের জন্ম রাজশাহীর এক সচ্ছল পরিবারে। তার মাতুলালয় ছিল ওপার বাংলার মুর্শিদাবাদে। পারিবারিকভাবে তারা ছিলেন বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু ১৯৭১ সালের স¦াধীনতাযুদ্ধের সেই লেলিহান শিখা তার জীবনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। যুদ্ধের বিভীষিকায় মা-বাবাকে হারানোর পর থেকেই শুরু হয় তার আশ্রয়হীন এক সংগ্রামের গল্প। যে বয়সে রূপকথার গল্প শোনার কথা ছিল, সেই বয়সে রোকেয়া শিখেছিলেন কিভাবে প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়।

তবে রোকেয়া বেগম কেবল ভাগ্যের ওপর ভরসা করে বসে থাকেননি। তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এবং দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা সেনানিবাসসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাহসের সাথে কাজ করেছেন। সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না তার। কিন্তু জীবন তাকে বারবার পেছনে টেনে ধরেছে। দু’টি বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনায় তার হাত ও পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ দুই মাস হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণার সাথে লড়েছেন তিনি। সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়টুকু শেষ হয়ে যায় সেই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে। সুস্থ হয়ে ফিরে যখন দেখলেন হাতে আর কোনো টাকা অবশিষ্ট নেই, তখন বাধ্য হয়েই দুই বছর আগে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাকে মগবাজারের রাস্তায় হাত পাততে নামতে হয়।

এই রোকেয়া বেগমের কষ্টের পাহাড় কেবল দারিদ্র্য নয়; বরং নিজ রক্তের সম্পর্কের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতাও। তিনি অভিযোগ করেন, তার দাদা ও নানাবাড়ির প্রভাবশালী আত্মীয়রা তার সাথে চরম প্রতারণা করেছে। মা-বাবার রেখে যাওয়া পৈতৃক সম্পত্তি থেকে তাকে কৌশলে বঞ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং মামলা-মোকদ্দমা চালিয়েও তিনি ন্যায্য পাওনা পাননি। আজ যখন তিনি নিঃস্ব, তখন সেই বিত্তবান আত্মীয়দের কাউকেই পাশে পান না। যখন সামর্থ্য ছিল তখন মানুষের ভিড় ছিল চার পাশে, আজ বিপদে পড়ে তিনি বুঝেছেন- এই সমাজে মানুষের চেয়ে অর্থের মূল্য কত বেশি।

দীর্ঘ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা রোকেয়া বেগমকে যেন এক জীবনমুখী দার্শনিক বানিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রখর। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ দেশে একটা পশুর দাম লাখ টাকা হতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের কোনো দাম নাই।’ তার মতে, সাধারণ মানুষ অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে দেশকে সুন্দর করতে চাইলেও ক্ষমতার রাজনীতি তা হতে দেয় না। ভারত-পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ- সব অঞ্চলের মানুষের জীবন নিয়ে কেবল দাবার ঘুঁটি চালাচালি হয় বলে তিনি মনে করেন। উন্নয়নের গালভরা বুলি থাকলেও সাধারণের ভাগ্য বদলায় না। তার ভাষায়, ‘লঙ্কায় যে যায় সে-ই রাবণ হয়।’ অর্থাৎ ক্ষমতার আস্বাদ পেলে মানুষ বড় তাড়াতাড়ি সাধারণের দুঃখ ভুলে যায়।

৬০-৬১-এর কোঠায় পৌঁছানো এই নারী আজও অবিবাহিত। এই দীর্ঘ জীবনে কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়ার সুযোগ তিনি পাননি। মগবাজারের এক ছোট ভাড়াবাসায় তার নিঃসঙ্গ বসবাস। দিনের শেষে মানুষের কাছে চেয়ে যা পান, তা দিয়েই চলে তার একক সংসার। এই জনসমুদ্রে তার একমাত্র সুখ-দুঃখের সাথী মাদারীপুরের হালিমা খাতুন। হালিমা একসময় মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন, এখন তিনিও রোকেয়া বেগমের মতো ভিক্ষাবৃত্তি করে বেঁচে আছেন। এই দুই নিঃস্ব নারী একে-অপরের ছায়া হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, যদিও তাদের সামনে কোনো স্থায়ী ঘর বা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নেই।

রোকেয়া বেগম নিজের জীবনকে ভালোবাসেন। শরীর ভাঙলেও মনের জোর হারাননি। শত কষ্টের মাঝেও তিনি স্রষ্টার প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন যে, তিনি আজও বেঁচে আছেন; কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তিনি এক জীবন্ত প্রশ্ন। কেন একজন শিক্ষিত এবং কর্মক্ষম নারীকে বার্ধক্যে এসে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হবে? কেন পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারল না?

মগবাজারের রেললাইনে ট্রেনের চাকার বিকট শব্দে হয়তো রোকেয়া বেগমের কথাগুলো প্রতিদিন চাপা পড়ে যায়; কিন্তু তার শান্ত চোখের চাউনি আমাদের সভ্য সমাজের অবক্ষয়কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তার সেই আর্তনাদ-‘আব্বা-আম্মার যুদ্ধে মারা যাওয়া ঠিক হয় নাই’ আসলে কোনো হারানো স্বজনের বিলাপ নয়; বরং অনিরাপদ পৃথিবীর বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদ।

আজকের বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ পেরিয়ে গেলেও রোকেয়া বেগমদের মতো প্রবীণদের জন্য ‘বেঁচে থাকা’ মানেই এক নিরন্তর যুদ্ধ। রাষ্ট্র তাদের ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ স্বীকৃতি দিলেও মগবাজারের মোড়ে তার প্রাপ্তি কেবল অবজ্ঞা। যে বয়সে নাতি-নাতনীদের সাথে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে ওষুধের উচ্চমূল্য আর মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলাতে তাকে লড়তে হচ্ছে কঠিন জটিলতার সাথে। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার এই যুগে রোকেয়া বেগম কেবল একজন ব্যক্তি নন; বরং আমাদের ভঙ্গুর সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।