৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ৩,৫০,৫৭৪ কোটি টাকা

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition
  • সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ’২৪-২৫ অর্থবছরে, ৯২,৬২৫ কোটি টাকা
  • সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন সম্ভব হচ্ছে না

দেশে বছরের পর বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েও তা আদায় করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায়ে বিশাল একটি ঘাটতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে এনবিআরকে। আর এই ঘাটতি পূরণে লক্ষ্যমাত্রার বাইরে গিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। বাজেট উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গেল ছয় অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় ঘাটতি হয়েছে তিন লাখ ৫০ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে এডিপি’র চেয়ে সাড়ে ৫০ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বেশি। উল্লেখ্য, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এডিপি’র আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা।

ঘাটতির কারণ : কম রাজস্ব আদায়ের প্রধান কারণ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সাপ্লাই চেইনে বিঘœ, উচ্চ উৎপাদন খরচ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সংসদে এ কারণগুলোই উল্লেখ করা হয়েছে।

৬ অর্থবছরে ঘাটতির বিবরণ : পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ছয় অর্থবছরের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় সবচেয়ে বেশি কম হয়েছে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে। সেই অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেয়া ছিল চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে প্রকৃত আয় হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।

এর পর সবচেয়ে বেশি রাজস্ব ঘাটতি ছিল সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে। এই অর্থবছরে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ওই অর্থবছরে আদায় হয়েছিল তিন লাখ ৬১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ছিল ৪৮ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা।

একইভাবে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৪১ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ছয় লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে দুই লাখ ৯৪ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। ঘাটতি ৩৫ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ এক হাজার কোটি টাকা। আদায় ছিল দুই লাখ ৬১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। ঘাটতি ৩৯ হাজার ৩১ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন

এ দিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বলেছেন , ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সরকার না থাকা, কম বিনিয়োগ, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে স্থবিরতা, কম উৎপাদন ও সরবরাহ এবং ভ্যাট ও সম্পূরক আবগারি শুল্ক দেয়া বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগ কম, আমদানি কম, উৎপাদন ও সরবরাহ কম এবং ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক দেয়া বিপুলসংখ্যক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, এ অর্থবছরে ২৫ শতাংশ ও ১০ শতাংশ শুল্ক হারের পণ্য আমদানি আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ৩৭ শতাংশ কমায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

জ্বালানি পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকার পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এলএনজি আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়, যার ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি বলে মন্ত্রী জানান।

বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় গাড়ি আমদানি কম হওয়ায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের ফলে ব্যবসা থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এটা করপোরেট কর আদায়ে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বলে টানা প্রায় ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহু গুণ বেড়ে যায়। এতে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় বা করযোগ্য উদ্বৃত্ত আয় কমে যায়।

মন্ত্রী আরো বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কটের কারণে অনেক তৈরী পোশাক ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্প তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি।

লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণ হিসেবে মন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন যে, উচ্চ সুদের হার এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে যায়। ফলে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা কমে গেছে, যা আয়করের একটি প্রধান উৎস।

আরো যত কারণ

বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রার অভাব, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কর ফাঁকির কারণে প্রতি বছরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির মুখে পড়ছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণ, সময়োপযোগী আইনি সংস্কার এবং এনবিআরকে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করার ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণগুলো

বাস্তবতার চেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা প্রতি বছরই জিডিপি ও প্রবৃদ্ধির হারের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

যেমন চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। এ জন্য রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে প্রায় ৪৪ শতাংশ, যা কখনো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

কর আদায় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা : কর অঞ্চলগুলোতে দক্ষ জনবলের অভাব, ম্যানুয়াল সিস্টেম ও আধুনিক প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহারের ফলে করফাঁকি রোধ করা কঠিন হচ্ছে।

আয়কর জালের সীমাবদ্ধতা : দেশের বিপুলসংখ্যক যোগ্য নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এখনো করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্কে ফাঁকি : আমদানি ও স্থানীয় বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ের সময় সুনির্দিষ্ট তদারকির অভাবে রাজস্বের বড় একটি অংশ আদায় করা যায় না।

বাড়ানোর উপায়

রাজস্ব বাড়াতে করণীয় ও সংস্কারগুলো পুরোপুরি অটোমেশন : কর অফিসে সরাসরি যাতায়াত কমিয়ে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা জোরদার করা। করজাল সম্প্রসারণ : শহরকেন্দ্রিক কর আদায়ের পাশাপাশি নতুন নতুন খাত চিহ্নিত করে করের আওতা বাড়ানো।

তদারকি জোরদার : কাস্টমস হাউজগুলোতে পোস্ট-ক্লিয়ারেন্স অডিট এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ করদাতাদের সমন্বিত আয়কর ও ভ্যাট অডিট পরিচালনা করা।

টাস্কফোর্স গঠন : এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-এই তিন উইংয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বকেয়া রাজস্ব ও ফাঁকি দেয়া কর উদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।