ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। দেশটি থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কিউবা ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য মার্কিনবিরোধী রাষ্ট্রে। এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কলোম্বিয়ার প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ রাজনীতিবিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গ্রিসে সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে- ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্পের এই হামলা কি কেবল একটি আঞ্চলিক অভিযান নাকি এটি বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পলিটিকো ম্যাগাজিন ১৩ জন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকের মতামত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলা বিশ্বকে একটি বহু-মেরুকেন্দ্রিক (সঁষঃরঢ়ড়ষধৎ) শক্তির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়ার বড় ইঙ্গিত। একই সাথে এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা সম্পর্কে অন্যান্য রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সন্দেহকে আরো গভীর করেছে। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষকের অভিমত- এই সঙ্ঘাত চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক বড় হুমকি সৃষ্টি করবে না।
চীনের প্রতি সরাসরি বার্তা : আমেরিকাস প্রোগ্রামের পরিচালক ও সিএসআইএস-এর ঋঁঃঁৎব ড়ভ ঠবহবুঁবষধ ওহরঃরধঃরাব-এর প্রধান রায়ান বার্গ মনে করেন, নিকোলাস মাদুরো চীনের বিশেষ দূতের সাথে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের এই অভিযান শুরু হওয়া কাকতাল নয়।
তার ভাষায়, এটি চীনকে স্পষ্ট বার্তা দেয়- ‘কর্তৃত্ববাদীদের অক্ষ’ শান্তিকালে যতই ঐক্যবদ্ধ দেখাক না কেন, শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়লে তারা একে-অপরের জন্য নির্ভরযোগ্য নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা আরো স্পষ্ট : ক্যাটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি অধ্যয়ন বিভাগের পরিচালক জাস্টিন লোগান বলেন, এই অভিযানের বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত হলেও এর রাজনৈতিক বার্তা সুদূরপ্রসারী।
তার মতে, ট্রাম্প নিজেকে ‘অপ্রত্যাশিত নেতা’ হিসেবে তুলে ধরেন, আর এই হামলা সেই ধারণাকে আরো শক্তিশালী করবে। ফলে বিশ্বনেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হবে- কেউ চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকবে, আবার কেউ কারাকাসের মতো পরিণতি এড়াতে নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজাবে।
তেল : ট্রাম্পের ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বর্ষীয়ান সাংবাদিক স্টিফেন কিনজার মনে করেন, আইজেনহাওয়ারের পর ট্রাম্পই সবচেয়ে বেশি সম্পদকেন্দ্রিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তার বিশ্লেষণে, ভেনিজুয়েলার তেল ট্রাম্পের কাছে একটি ‘মহাপুরস্কার’। রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে দেশগুলোর চাপে তিনি ভেনিজুয়েলাকে বিকল্প উৎস হিসেবে দাঁড় করাতে চান, যা তেলকে সরাসরি একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করছে।
লাতিন আমেরিকা : পুরনো নিয়মে ফেরা?
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এমা অ্যাশফোর্ড বলেন, ভেনিজুয়েলায় এই হামলা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোলার্ধে নিয়ম ভাঙার দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা।
অন্য দিকে ডিফেন্স প্রাইরিটিজের ফেলো ড্যানিয়েল আর ডেপেট্রিস সতর্ক করে বলেন, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
লাভ-ক্ষতির হিসাব : লাজারাস কনসাল্টিংয়ের সিইও লেল্যান্ড লাজারাস মনে করেন, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র এক ঢিলে একাধিক পাখি মারতে পারে- তেলের দাম কমানো, মাদক পাচার দমন, চীন-রাশিয়া-ইরানকে কৌশলগত অবস্থান থেকে সরানো এবং কিউবা ও নিকারাগুয়ার মতো মিত্রদের দুর্বল করা।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গেরিলা যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ইরাক ও আফগানিস্তানের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ : সাবেক মার্কিন কূটনীতিক রায়ান ক্রোকার বলেন, মাদুরো বিদায় নিলেও শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। রাশিয়া ও চীন যদি নীরব থাকে, তবে এটি সত্যিই ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বের দিকে বড় পদক্ষেপ হতে পারে, যা ইউক্রেন ও তাইওয়ানের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
উপসংহার : বিশ্লেষকদের সামগ্রিক অভিমত হলো- ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্পের আক্রমণ কেবল একটি দেশের সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের নতুন রূপ, জ্বালানি রাজনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের স্পষ্ট সঙ্কেত। এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকে আরো বিভক্ত করবে কিনা, নাকি নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে তুলবে তার উত্তর নির্ভর করছে পরবর্তী ধাপে রাশিয়া, চীন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।



