সড়কে অব্যবস্থার রাজত্ব বাড়ছে দুর্ঘটনা প্রাণহানি

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার অনিবার্য ও ‘নীরব মহামারী’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনার অন্তরালে অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন অনেকেই।

Printed Edition

আবদুল কাইয়ুম

  • ২৪ শতাংশ বাসের ফিটনেস ও ২২ শতাংশের রুট পারমিট নেই
  • ট্রাফিক আইন প্রয়োগে অদৃশ্য রাজনৈতিক বাধা
  • ফুটপাথের অবাধ দখলে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুতগতিতে ছুটছে একটি বাস, একই সময়ে ফুটপাথ দখল হয়ে থাকায় মূল সড়কে নেমে আসতে বাধ্য হচ্ছেন পথচারীরা। কয়েক সেকেন্ডের এই বিশৃঙ্খলা আর অব্যবস্থাপনার চক্করে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার অনিবার্য ও ‘নীরব মহামারী’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনার অন্তরালে অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন অনেকেই।

তবে সড়কে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ‘অদৃশ্য চাপ’। টিআইবির এক গবেষণা অনুযায়ী, বেসরকারি বাস পরিবহন খাতে বছরে প্রায় এক হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা বা অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়।

এই চাঁদাবাজির সাথে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, হাইওয়ে পুলিশ এবং বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ৯২ শতাংশ বাস মালিক কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের। এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সিন্ডিকেটের কাছে পুরো খাত জিম্মি হয়ে আছে এবং আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর মোট রাস্তার মাত্র ৭ শতাংশ সড়ক এলাকা, যেখানে আদর্শগতভাবে ২৫ শতাংশ থাকা প্রয়োজন। এর ওপর ফুটপাথের ৪০ শতাংশই দোকান, হকার ও নির্মাণসামগ্রীর দখলে থাকে। আর ঢাকার ফুটপাথ দোকান, হকার ও নির্মাণসামগ্রীর দখলে থাকায় মূল সড়কে নামতে বাধ্য হন পথচারীরা এবং দ্রুতগতির যানবাহনের চাপায় প্রাণ হারান। টিআইবি ও বিআইজিডি’র তথ্যমতে, ঢাকার ফুটপাথ থেকে বার্ষিক প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকার অবৈধ ভাড়া বা চাঁদাবাজি হয়, যা সিটি করপোরেশনের বাজেটের চেয়েও বেশি হতে পারে।

তা ছাড়া দেশের সড়কে লাইসেন্সহীন চালক এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপট এখন চরম উদ্বেগজনক। বিআরটিএ’র তথ্যমতে, দেশে প্রায় ১৮ দশমিক ৭৭ লাখ চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ভারী যানবাহন চালকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ; তাদের লাইসেন্সের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত জাল হতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিআরটিএ’র জনবল সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে দালালচক্র পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ পাইয়ে দেয়ার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো, বর্তমানে মাত্র ৪১ জন পরিদর্শক দিয়ে সারা দেশের ২০ লাখের বেশি যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করা বিআরটিএ’র জন্য একপ্রকার অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক স্বীকার করেছেন যে তাদের প্রতিষ্ঠানের বাসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। এ ছাড়া ২৪ শতাংশ বাসের ফিটনেস সনদ এবং ২২ শতাংশের রুট পারমিট নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক প্রাণহানির সংখ্যা ২০ হাজার ৭৩৬ থেকে ২১ হাজার ৩১৬ জনের মধ্যে হতে পারে এবং এর ফলে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, ২০২০ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজার ৭১২ জন। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশেরই বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

এ দিকে রাজধানী ঢাকার চিত্র আরো ভয়াবহ। গবেষণার তথ্যমতে, গত সাড়ে ছয় বছরে রাজধানীতে এক হাজার ৮৪৯টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ৩৮৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশই ছিলেন পথচারী। এ ক্ষেত্রে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়ককে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানীতে দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হলো রাতে এবং ভোরে মালবাহী ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি, কারণ এই সময়েই ঢাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির তথ্যমতে, হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে প্রতিদিন আসা রোগীদের ৪০ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার, যাদের অধিকাংশই ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ‘চালকের ভুল’ নয়, এটি পুরো পরিবহন ব্যবস্থার স্তরে স্তরে ব্যর্থতার চিত্র। চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, মালিকের দৈনিক জমা তোলার চাপ এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ সড়কের নকশা ও সিগন্যাল ব্যবস্থার অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্র যদি সড়কের নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের হাত থেকে উদ্ধার করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারে, তবে দুর্ঘটনার এই মিছিল থামানো অসম্ভব। শুধু সাময়িক ‘কঠোর অভিযান’ নয়, বরং একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগই হতে পারে নিরাপদ সড়কের একমাত্র পথ।

এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক এবং পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো: শামসুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যানজট, দুর্ঘটনা এবং দূষণ যে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার মূল কারণ হলো সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাফিক সিস্টেমের মূল ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা; কিন্তু আমাদের দেশে বাসের বিশৃঙ্খলার সাথে এখন যুক্ত হয়েছে মোটরসাইকেল ও ইজি-বাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। এই বিশৃঙ্খলা যত বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজটের মাত্রাও তত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এআই নিজে কিছু করতে পারে না; এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ এবং শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল। ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো মাঠ পর্যায়ের কাজ ফাঁকি দিয়ে প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা। পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে এআই এসে সব সমাধান করে দেবে এবং তারা বাসের পাল্টাপাল্টি চলাচল, অবৈধ পার্কিং ও ফুটপাথ দখলের মতো মাঠ পর্যায়ের বিশৃঙ্খলাগুলো দূর করবে না, তবে সমস্যা আরো জটিল হবে। ইজিবাইকের মতো যানবাহনগুলো যখন কোনো নিবন্ধন ছাড়াই সিস্টেমে ঢুকে পড়ে, তখন এআই সেগুলোকে শনাক্ত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে এই অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনা কমার পরিবর্তে বেড়েই চলেছে।

সরকারকে দায়ী করে অধ্যাপক ড. মো: শামসুল হক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বর্তমান সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশলপত্র বা রোডম্যাপ এখনো দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক মহলে ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনরুজ্জীবিত করা বা সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অর্থায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনাকে কেবল পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে আড়াল করার চেষ্টা করলে বা মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা না করে কেবল প্রযুক্তির দোহাই দিলে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সড়ককে নিরাপদ করতে হলে আগে সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি যানবাহনের সঠিক ডেটাবেজ থাকতে হবে এবং লাইসেন্সহীন গাড়ির দাপট বন্ধ করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি ফুটপাথ দখলমুক্ত করা এবং গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। অন্যথায়, শুধু প্রযুক্তি নির্ভরতার ফাঁকা বুলি দিয়ে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা যাবে না।