- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
‘আমরা কি এখনো ফ্যাসিস্টের মাথার মুকুট পরে বসে থাকব’- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম ও নির্যাতন মামলার জেরা চলাকালে এই মন্তব্য করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটু। গতকাল রোববার সাক্ষী ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমানের জেরা চলাকালীন প্রসিকিউশনের আপত্তির প্রেক্ষিতে তিনি এই প্রশ্ন তোলেন।
টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জেরা অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানির এক পর্যায়ে আসামিপক্ষ অর্থাৎ কর্নেল কে এম আজাদের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটু ব্যারিস্টার আরমানের অপহরণের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আইনজীবী আরমানের লেখা বই ‘আয়না ঘরের সাক্ষী : গুম জীবনের আট বছর’-এর ৩৬ পৃষ্ঠার একটি লাইন উদ্ধৃত করে বলেন যে, সেখানে জুতা নেয়ার যে বর্ণনা আছে তা থেকে প্রতীয়মান হয় র্যাব বা অন্য কোনো সংস্থা তাকে অপহরণ করেনি। জবাবে ব্যারিস্টার আরমান দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘ইহা সত্য নহে।’
এরপর আরমান গুম থেকে উদ্ধারের সময় তার কাঁধের গামছা, পরিহিত লুঙ্গি ও টি-শার্ট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কেন দেননি, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। টিটু দাবি করেন, ওই পোশাকগুলো মূলত একটি ডকুমেন্টারি তৈরির উদ্দেশ্যে পরা হয়েছিল। আরমান এই দাবিও প্রত্যাখ্যান করে জানান, পোশাকগুলো সংরক্ষিত না থাকায় তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে দিতে পারেননি। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ডকুমেন্টারিতে থাকা লুঙ্গি এবং টি-শার্ট সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে আরমান বলেন, সেগুলো সিসিটিভি ফুটেজের অংশ। এ ছাড়া অপর এক প্রশ্নের জবাবে আরমান জানান, তার চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থাপত্র তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেয়া হয়নি এবং কোনো ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা নিয়েছেন কি না, তা তার স্পষ্ট স্মরণ নেই।
জেরার এক পর্যায়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউশন টিম আসামিপক্ষের প্রশ্নের ধরনে আপত্তি জানান। তারা রুল ৫৩ এবং আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার আপিল বিভাগের রায়ের নজির টেনে বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দী এবং আদালতে দেয়া জবানবন্দীর ছোটখাটো গরমিল নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আইনজীবী আমিনুল গণি টিটু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে সরকারকে আমরা ফ্যাসিস্ট বলি (হাসিনা সরকার) এটা সেই সরকারের আমলের রুল। তিনি প্রশ্ন করেন, আমরা কি এখনও ফ্যাসিস্টের মাথার মুকুট পরে বসে থাকব? বিতর্কের এক পর্যায়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি নিয়ে আপত্তি জানালে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেন, তারা জানেন কোনো জিনিস কেন লিখতে হবে। বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
জেরার সময় ট্রাইব্যুনালে ব্যারিস্টার আরমানের গুমজীবন নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনে প্রদর্শিত ভিডিওর ১৯ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে লুঙ্গি-টিশার্ট ও ঘাড়ে গামছা পরা ছিলেন ব্যারিস্টার আরমান। যেটি সিসিটিভির ফুটেজ থেকে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এরপর আমিনুল গনি টিটু কোর্টে দেয়া জবানবন্দী আর তদন্তকর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দী তুলনা করতে থাকেন। এটা নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আপত্তি জানালে এ বিষয়ে আর কোনো কথা হয়নি।
এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেমসহ সাত আসামির পক্ষে জেরার জন্য সময় চান আইনজীবী তাবারক হোসেন। তিনি বলেন, আপিল বিভাগের যে রায়ের প্রসঙ্গ এখানে নিয়ে আসা হয়েছে, তা নিয়ে আমার স্টাডি করতে হবে। এ জন্য আমার কয়েক দিন সময় লাগবে। এ সময় আপত্তি জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। পরে জেরার জন্য আগামী ১০ মার্চ দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
রোববার সকালে এ মামলায় গ্রেফতার ১০ আসামিকে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো: মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম।
শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খায়রুল ইসলাম।



