ইতিহাসের পাতায় সেরা বাবা : পল্লব শাহরিয়ার

Printed Edition
ইতিহাসের পাতায় সেরা বাবা : পল্লব শাহরিয়ার
ইতিহাসের পাতায় সেরা বাবা : পল্লব শাহরিয়ার

তোমরা কি জানো, আমাদের এই পৃথিবীর আসল ইতিহাসেও এমন কিছু বাবা ছিলেন, যাদের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা দেখে পুরো দুনিয়া অবাক হয়ে গিয়েছিল? আজকে আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টে চিনে নেব এমন পাঁচজন বাবাকে, যাদের গল্প রূপকথার চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর আর আবেগের!

সম্রাট বাবর ও হুমায়ুন : মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের গল্প তোমরা অনেকেই হয়তো ইতিহাসে পড়েছ। কিন্তু বীর এই যোদ্ধার মনের ভেতর যে কতটা নরম একজন বাবা লুকিয়ে ছিলেন, তা জানা যায় একটি সত্য ঘটনা থেকে। বাবরের ছেলে হুমায়ুন একবার কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন। রাজবৈদ্যরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে সুস্থ করতে পারছিলেন না। হুমায়ুনের অবস্থা যখন একদম মরোমরো, তখন বাবা বাবর এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। তিনি হুমায়ুনের বিছানার চার পাশে ঘুরে প্রভুর কাছে প্রার্থনা করলেন, হে প্রভু! আমার ছেলের রোগ তুমি আমাকে দিয়ে দাও, ওর বদলে তুমি আমার জীবন নিয়ে নাও। ইতিহাস বলে, অলৌকিকভাবে এর পর থেকেই হুমায়ুন আস্তে আস্তে সুস্থ হতে থাকেন আর বাবর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সন্তানের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখার এমন গল্প ইতিহাসে সত্যিই বিরল!

এডিসন ও তার বাবা-মা : তোমাদের ঘরের যে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে, তা আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। ছোটবেলায় এডিসন কিন্তু একদমই পড়ালেখা পারতেন না। একদিন স্কুল থেকে তাকে একটা চিঠি দিয়ে বের করে দেয়া হয়। চিঠিতে লেখা ছিল, আপনার ছেলে খুবই গাধা, তাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। এডিসনের বাবা স্যামুয়েল এডিসন এবং তার মা কিন্তু হাতাশ হননি। বাবা স্যামুয়েল এডিসন ছেলেকে ঘরে বসেই নিজে পড়াতে শুরু করেন। তিনি এডিসনকে বিজ্ঞান আর ইতিহাসের নানা বই এনে দিতেন এবং প্রতিটি বই পড়ার জন্য পুরস্কার হিসেবে সামান্য কিছু টাকা দিতেন, যাতে এডিসনের পড়ার আগ্রহ বাড়ে। বাবার এই সুন্দর বুদ্ধি আর সমর্থনের কারণেই কিন্তু স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেয়া সেই ‘গাধা’ ছেলেটি একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছিল।

চার্লি ও মেয়ে জেরাল্ডিন: সিনেমা জগতের সবচেয়ে হাসির মানুষ চার্লি চ্যাপলিনকে তোমরা নিশ্চয়ই চেনো? বড় চশমা, ঢিলেঢালা প্যান্ট আর গোঁফ ওড়ানো সেই চ্যাপলিন কিন্তু বাস্তব জীবনে ছিলেন একজন ভীষণ একনিষ্ঠ বাবা। তার মেয়ে জেরাল্ডিন যখন অভিনয়ে নামেন, তখন চ্যাপলিন তাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিটি ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবেগঘন চিঠি হিসেবে পরিচিত। চ্যাপলিন লিখেছিলেন, মা রে, যখন মঞ্চের আলোয় দর্শকরা তোর অভিনয়ে হাততালি দেবে, তখন একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখিস। সেখানে কিন্তু কোনো তালি বাজবে না। কারণ ওপরের দুনিয়ায় কোটি কোটি মানুষ খালি গায়ে, খালি পেটে ঘুমাচ্ছে। তুই যতই বড় শিল্পী হস না কেন, মানুষের কষ্টকে কখনো ভুলে যাস না। একজন বাবা কীভাবে তার সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেন, এই চিঠিটি তার অনন্য উদাহরণ।

নিউটন ও তার সৎ বাবা : স্যার আইজ্যাক নিউটন, যিনি গাছের ওপর থেকে আপেল পড়া দেখে মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, তার জীবনের গল্পটা একটু অন্যরকম। নিউটন জন্মানোর আগেই তার নিজের বাবা মারা যান। এরপর তার মা যখন দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন, তখন তার সৎ বাবা রেভারেন্ড বার্নাবাস স্মিথ নিউটনকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসেন। নিউটন যাতে ভালো স্কুলে পড়তে পারেন এবং তার পড়ালেখা যেন কখনো বন্ধ না হয়, সেজন্য তার সৎ বাবা বিশাল এক লাইব্রেরি এবং অনেক সম্পত্তি নিউটনের নামে রেখে যান। নিজের জন্মদাতা বাবা না হয়েও একজন মানুষ যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য এতটা চিন্তা করতে পারেন, রেভারেন্ড স্মিথ তা প্রমাণ করে গেছেন।

লিংকন ও তার ছেলে : আমেরিকার বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার ছেলের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে একজন বাবা হিসেবে তিনি শিক্ষকের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, আমার ছেলেকে শেখাবেন- সব মানুষ কিন্তু সৎ হয় না। তবে তাকে এটিও শেখাবেন, পৃথিবীতে যদি একজন ভণ্ড মানুষ থাকে, তবে একজন ভালো মানুষও আছে। তাকে বইয়ের জাদুকরি দুনিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন, পাশাপাশি আকাশ আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার অবসরও দেবেন। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ ও মানসিক বিকাশের জন্য একজন বাবার এই আকুতি আজও পৃথিবীর সব বাবা-মায়ের জন্য এক মস্ত বড় গাইডলাইন।

ইতিহাস হোক কিংবা বর্তমান- সন্তানের মঙ্গলের জন্য বাবাদের চিন্তা আর ভালোবাসার কোনো কমতি থাকে না।