টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
  • বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রাজনৈতিক অস্থিরতায়
  • ঋণে সুদহার বেড়ে যাওয়ায় কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ
  • টিকতে না পেরে গুটিয়ে নিচ্ছেন অনেকে
  • পাচ্ছেন না সরকারি সহযোগিতা, অভিযোগ উদ্যোক্তাদের

২০০১ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ ট্যানারি মোড় এলাকায় জুতা, ভ্যানিটি ও মানিব্যাগ, বেল্টসহ চামড়ার বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারখানা শুরু করেন আরমান লেদার গুডস ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল সরকার। তখন তিনি ২৫ থেকে ২৬ জন কারিগর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। এই জুতা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্রেতারা এলাকার ব্যবসায়ীরা কিনে নেন। তখন উৎপাদন ও দাম ভালো হওয়ায় পাইকারির পাশাপাশি নিজের দোকান খোলেন তিনি। তবে প্রতিনিয়ত শ্রমিক সঙ্কট, কেমিক্যাল ও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন আগের চেয়ে কমে যায়। এতে করে বর্তমানে মাত্র ১২ জন শ্রমিক নিয়ে জুতা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন আবুল সরকার।

সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে আরমান লেদার গুডসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইসমাঈল হোসাইন বলেন, চামড়া ট্যানারি শিল্প বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এটি শুধু বাংলাদেশে নয় বিদেশী নাগরিকদের কাছে পছন্দের পণ্য। তবে লেবার সঙ্কট ও কেমিক্যাল এবং বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হচ্ছে। এতে করে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আমাদের দেশের সরকার যদি এই শিল্পটির দিকে নজর দেয় তাহলে আরো ব্যাপকভাবে চামড়া শিল্প সফল হবে। সরকারের উচিত চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং করা। তাহলে চামরা শিল্প আরো বিশ্ব দরবারে ফুটে উঠবে। তা ছাড়া ঢাকাসহ দেশে চামড়ার জুতা, লেডিস ব্যাগ, মানিব্যাগ, অফিস ব্যাগের চাহিদা অনেক, আমাদের কাছে বিদেশী কাস্টমারও আসে।

অন্য দিকে ২০২০ সালে অল্প পরিসরে কিছু স্বপ্নবাজ যাত্রা শুরু করে ‘বাংলা ফুড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি খাঁটি ঘি, মধু, সরিষার তেল, খেজুর, সুইটস অ্যান্ড বেকারি উৎপাদন করে যাচ্ছে। বর্তমানে কুমিল্লা শহরে ছয়টি শাখায় প্রায় ৩০ জন লোকের কর্মসংস্থান সেখানে। তবে দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি, তারল্য সঙ্কট, জটিল ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক ঋণে জটিলতা, বাজারে ভেজাল পণ্যের সয়লাব, অসাদু মজুদদার (হোলসেল মার্কেটের সিন্ডিকেট), দক্ষ জনবলের অভাবে এখন বাংলা ফুড পরিচালনা করতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েও লড়াই করে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

এই বিষয়ে বাংলা ফুডের সিইও আবু নাইম বলেন, আমরা সবসময় কোয়ালিটিকে গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব উৎপাদিত পণ্যগুলোর দিকে ফোকাস দিচ্ছি। তারল্য সঙ্কট নিরসনে ব্যক্তিপর্যায়ে চেষ্টা করছি। তবে দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস সঙ্কট, অসাধু মজুদদার, মৌলিক চাহিদার পণ্যগুলো বিলাসী পণ্যের তালিকাতে নিয়ে শুল্ক দিয়ে আমদানি করায় সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের উৎপাদনের পাশাপাশি আয়ও কমেছে। আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারকে দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ, সুদমুক্ত সহজ কিস্তিতে ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় সব আইন নিয়ে সেক্টরভিত্তিক আলাদা করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিএসটিআইসহ সব প্রতিষ্ঠানের সেবা সহজলভ্য করা ও সহজ ভ্যাট ও ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা করা অত্যান্ত জরুরি।

শুধু তারাই নয়, দেশের সব উদ্যোক্তাদের পরিস্থিতি একই। অনেক উদ্যোক্তা বর্তমানে পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। ডলারের উচ্চমূল্য, ক্রমবর্ধমান সুদহার, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা এবং বিদেশী পণ্যের চাপ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াইকে কঠিন করেছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র শিল্প খাতকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং শিল্পে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে এসএমইর অবদান অপরিসীম। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে এই খাতটি সঙ্কটের মুখোমুখি।

প্রায় ৭৮ লাখ সিএমএসএমই মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখছে। মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এসব শিল্পে জড়িত। এমনিতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রভাব বেশি পড়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর। সুদ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। চলমান অস্থিরতায় ভোগ্য বা অত্যাবশ্যকীয় নিত্যপণ্য নয়- এমন পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। ফলে ক্ষুদ্র-উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানে বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে ঋণের সুদহারের বাড়তি চাপ অন্য দিকে ব্যবসায় পরিচালন খরচ বহনের বিষয়টি সামনে আসছে। এ কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রেখেছেন অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ তার অন্যতম। ক্ষুদ্র ব্যবসা খুব সহজেই শুরু করা যায়। এই ব্যবসার জন্য খুব বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয় না। তেমন কোনো অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হয় না। ফলে যে কেউ চাইলে খুব অনায়াসে এই ধরনের ব্যবসা চালু করতে পারে। এক কথায় ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই ধরনের ব্যবসা ক্ষুদ্র হলেও অর্থনীতিতে এর ভূমিকা অনেক বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

বাংলাদেশের শিল্পনীতি-২০১৬ সালের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০০ জন পর্যন্ত কর্মীর প্রতিষ্ঠান অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। এমএসএমই খাত পণ্য ও পরিষেবার ৩৩টি উপখাতে বিভক্ত। তবে অনেক উদ্যোক্তা ঋণের সুদ বা কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চলছে অস্বাভাবিক অবস্থা, অথচ ব্যাংকের ঋণ প্রদানের অবস্থা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়েও কঠোর। সব মিলিয়ে দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা আসলেই বেশ খারাপ। এই সংখ্যা যদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় তাহলে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে প্রায় আট লাখ, ২০২১ সালে ৯ লাখ ৩৯ হাজার, ২০২২ সালে ১১ লাখ ২৪ হাজার, ২০২৩ সালে ১৩ লাখ ১৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে ১৩ লাখ ৪৪ হাজার উদ্যোক্তা ঋণ নিতে পেরেছেন। ঋণ গ্রহীতার এই পরিসংখ্যান বলছে, বিপুল পরিমাণ উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংকঋণের ধারে-কাছেও নেই।

২০১৯ সালের শিল্প খাতের জরিপ অনুযায়ী, দেশে গৃহকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া ৪৬ হাজার ২৯১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে, যার ৯৩ শতাংশই অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই জরিপ অনুযায়ী, অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ৯০ শতাংশ ব্যবসা এবং ৫০ শতাংশের অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে। তাদের ভাষ্য মতে, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় আট লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা দেশের ৮৭ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এসব প্রতিষ্ঠান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মূলধনের অভাব। যথাযথ কাগজপত্র না থাকায় ঋণ প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতের ধারাবাহিক তথ্য না থাকায় অর্থনৈতিক বিন্যাস ও খাতের অবস্থা মূল্যায়ন কঠিন। যদি অর্থনৈতিক সংখ্যায় দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ১০ থেকে ৩০ জন মানুষকে সরাসরি চাকরি দেয়। স্থানীয় ব্যবসা, কাঁচামাল সরবরাহকারী ও পরিবহন খাতসহ পরোক্ষভাবে আরো কয়েকগুণ মানুষ এই খাতের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে এক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে গ্রামের বা শহরের বৃহৎ জনগোষ্ঠী জড়িত থাকে।

আমদানিকৃত পণ্য ও উপকরণের দাম বাড়িয়ে শুল্ক ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে আরো চাপে ফেলেছে। অনেক ছোট ব্যবসার মালিক জানিয়েছেন যে তারা তাদের প্রবৃদ্ধি বিলম্বিত করছেন, নিয়োগ স্থগিত করছেন, অথবা টিকে থাকার জন্য দাম বাড়াচ্ছেন। এই শর্তগুলো স্পষ্ট চুক্তির শর্তাবলীর গুরুত্বকে তুলে ধরে যা খরচের ঝুঁকি বরাদ্দ করে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত মোকাবেলা করে।