নয়া দিগন্ত ডেস্ক
পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইরানকে নিঃশেষ করতে ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ প্রয়োগ করছেন বলে মন্তব্য করেছেন তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি। গতকাল বৃহস্পতিবার আলজাজিরাকে দেয়া সাাৎকারে তিনি এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
আলী আকবর দারেইনি জানান, সরাসরি সামরিক আঘাত হানার আগে শত্রুকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে দুর্বল করাই হলো এই কৌশলের মূল ল্য। তিনি বলেন, ‘যেভাবে অ্যানাকোন্ডা সাপ শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, যুক্তরাষ্ট্রও ঠিক একই কৌশল অনুসরণ করছে, কারণ বিগত পাঁচ মাসে তাদের গৃহীত পদপেগুলো ব্যর্থ হয়েছে।’ তবে এই বিশ্লেষক জোর দিয়ে বলেন, ইরান অতীতে যেমন একাধিক নিষেধাজ্ঞা প্রতিহত করেছে, এবারো তেমনি টিকে থাকবে। তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন যা তিনি যেমন জিততে পারছেন না, তেমনি বেরও হতে পারছেন না।
অভ্যন্তরীণ সঙ্কট থেকে নজর সরানোর কৌশল : আরাকচি
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরুর হুমকির তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি মন্তব্য করেছেন, এই ধরনের পদপে আসলে আমেরিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার একটি কৌশল মাত্র। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় আরাকচি লেখেন, ‘তথাকথিত ইকোনমিক ডি-ডে আমেরিকার নিজস্ব সঙ্কটের দিক থেকে নজর সরানোর চেষ্টা, যার মধ্যে রয়েছে অভূতপূর্ব ঋণ এবং লাফিয়ে বাড়তে থাকা সুদের খরচ।’
তিনি আরো উল্লেখ করেন, ব্যর্থ নীতিগুলোকে বারবার জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা কেবল আরো পরাজয় এবং ইরানিদের শত্রুতাকে ডেকে আনবে। মার্কিন অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ পুরো বিশ্ব অর্থনীতি এবং সার্বিক সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অন্য দিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এক্স-এ বলেন, সামরিকভাবে নিজেদের ল্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন এখন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ নেমেছে। তিনি বলেন, তারা দাবি করছে, ইরান পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এবং একটি সুতোয় ঝুলছে; অথচ তারাই তাদের সব মিত্রকে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করছে।
তিনি আরো বলেন, সমস্যা হলো তাদের ভুল হিসাব। প্রতিবার তারা নিজেদের ভুল হিসাব আড়াল করার চেষ্টা করে, তখনই তারা নিজেদের জন্য আরো বড় ব্যর্থতা তৈরি করে। সামরিক যুদ্ধ তার ল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, আর এখন তারা তাদের পরবর্তী ব্যর্থতার নাম দিয়েছে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দেন, ওয়াশিংটন কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালু করতে যাচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, তেহরানকে যেকোনো উপায়ে সমর্থনকারী যেকোনো দেশকে মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্প যোগ করেন, এটি একটি ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হতে যাচ্ছে এবং ইরানের এই হুমকিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও পরাজিত করতে আমেরিকার সব মিত্রদের একসাথে দাঁড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু এই অর্থনৈতিক অভিযান ঠিক কী ধরনের হবে বা কী কী পদপে নেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত কিছু জানাননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি আরো বলেন, যেসব দেশ তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যেকোনো ধরনের লাইফলাইন বা টিকে থাকার সহায়তা দেবে তাদেরকেও এই অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্প আরো বলেন, তেল পাচার, সোয়াপ লাইন, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান, জাহাজের নিবন্ধন, নামসর্বস্ব বা আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত কোম্পানিÑ সবকিছু এখনই বন্ধ করতে হবে। আপনারা জানেন, আপনারা কারা।
হোয়াইট হাউজে একটি অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, আমাদের এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর ওপর আমরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারি। আমাদের খুবই কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এখন দেখা যাক কী ঘটে। তিনি জানান, ইরানকে আর্থিক বা সামরিক সহযোগিতা প্রদান কিংবা দেশটির সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখা যেকোনো রাষ্ট্রকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
উভয় দেশের মধ্যকার সঙ্ঘাত ছয় মাসে পদার্পণ করার প্রোপটে এই ঘোষণা এলো। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি, চলমান যুদ্ধকৌশলের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলায় এবং সামরিক বাহিনীর দীর্ঘায়িত উপস্থিতি নিয়ে ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, তিনি কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সর্বাপো কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুমোদন দিচ্ছেন, যা হবে মূলত নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা।
তিনি আরো স্পষ্ট করেন, যেসব দেশ তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি দফতরের মাধ্যমে ইরানকে ন্যূনতম সহায়তার পথ সুগম করবে, তাদেরকেও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শাস্তিমূলক পদেেপ পড়তে হবে। কোন কোন রাষ্ট্রকে বা কী সুনির্দিষ্ট কৌশলে এই শাস্তির আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি। তবে তেল চোরাচালান, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রাবিনিময় কেন্দ্র, জাহাজের সনদ প্রদান এবং বেনামি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অবলিম্বে বন্ধের তাগিদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন অর্থসংক্রান্ত মন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ট্রেজারি বিভাগের নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, নৌপথের অবরোধ বলবৎ রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার এই যৌথ প্রক্রিয়া বহুগুণে জোরদার করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেয়া এক সাাৎকারে বেসেন্ট মন্তব্য করেন, বিশ্ববাসী আগে কখনো একটি দেশের বিরুদ্ধে এমন সমন্বিত অর্থনৈতিক অবরোধ দেখতে পায়নি। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বেশ কিছু দিন ধরেই ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে ইরানের রাজস্ব আয়ের কৌশলগুলোকে ল্য করে একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে চলেছে।



