নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও এ দেশের ২০ লাধিক কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থী চরম বাজেট বৈষম্য ও পদ্ধতিগত অবহেলার শিকার হয়ে নিজ দেশেই পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছে। শিক্ষা খাতে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ থাকলেও ৪০ হাজার মাদরাসার এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর দতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ শূন্য।
এই বৈষম্য দূর করে কওমি তরুণদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে গতকাল রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে ‘সাধারণ আলেম সমাজ’-এর উদ্যোগে ‘কওমি তরুণদের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম। বিশিষ্ট গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক আলেম মুসা আল হাফিজের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় তরুণ আলেম, গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদগণ উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মহান জনযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের চরম অর্থনৈতিক ও বাজেট বৈষম্য, যেখানে পূর্ব পাকিস্তান মোট জনসংখ্যার ৫৬% হওয়া সত্ত্বেও বাজেটের বেশির ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ২০২৬ সালে এসেও স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখের বেশি কওমি জনগোষ্ঠী একই ধরনের কাঠামোগত বাজেট বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। বৈঠকে বক্তারা দেওবন্দী ঘরানার মূলনীতি উসুলে হাশতেগানার ব্যাখ্যা করে বলেন, উসুলে হাশতেগানা প্রণীত হয়েছিল মাদরাসার প্রশাসনিক স্বাধীনতা, পাঠ্যক্রম এবং অভ্যন্তরীণ পরিচালনাকে রাষ্ট্র ও শাসকের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য। এর অর্থ এই নয় যে, কওমি শিক্ষার্থীরা এ দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা ও দক্ষতা উন্নয়নের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে। মাদরাসার স্বকীয়তা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণœ রেখেই তরুণদের নাগরিক অধিকারের বাজেট নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ বিষয়ে কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা নিয়ে বৈঠকে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, ২০ লাধিক কওমি শিক্ষার্থীর কণ্ঠ কেন আজ হারিয়ে গেছে? দলগুলো কি কওমি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের রাজনীতি করছে নাকি কেবল তাদের আবেগ ও ভোট ব্যাংকে রূপান্তর করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছে? আলেমদের স্পষ্ট বার্তা- কওমির নামে রাজনীতি করলে শুধু ভোটের সময় নয়, বাজেটের সময়ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠক থেকে উপস্থাপিত সুনির্দিষ্ট বাজেট দাবিমালা : ১. শিক্ষা সহায়তা ও জাতীয় বৃত্তি : কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য মেধাভিত্তিক ও প্রয়োজনভিত্তিক বিশেষ জাতীয় উপবৃত্তি এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য জাতীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ রাখা। ২. দক্ষতা উন্নয়ন ও আইটি প্রশিক্ষণ : সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, কারিগরি ও আধুনিক কৃষি বিষয়ে সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখা। ৩. ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি : কওমি তরুণদের জন্য স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা এবং বিশ্বমানের অনলাইন শিক্ষা ও ই-লাইব্রেরি রিসোর্সে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ৪. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সূরা : শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি চিকিৎসা ও কল্যাণ তহবিল গঠন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মাদরাসাগুলোর জন্য বিশেষ পুনর্বাসন বাজেট বরাদ্দ করা। ৫. পেশাগত ক্যারিয়ার উন্নয়ন : চাকরির বাজারে সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, ইন্টার্নশিপ এবং ইমাম, খতিব ও শিক্ষকদের পেশাগত মান উন্নয়নে বিশেষ সরকারি একাডেমির সংস্থান করা।
সমাপনী বক্তব্যে সাধারণ আলেম সমাজের মুখপাত্র রিদওয়ান হাসান বলেন, শিক্ষার ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকারে কোনো ভিন্নতা থাকতে পারে না। তিনি ঘোষণা করেন, আজকের গোলটেবিল বৈঠক থেকে গৃহীত এই সুপারিশমালাকে একটি চূড়ান্ত খসড়া নীতিমালায় রূপান্তর করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) স্মারকলিপি হিসেবে পেশ করা হবে এবং এর পক্ষে দেশব্যাপী কওমি তরুণদের নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক জনমত গড়ে তোলা হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন গবেষক আলেম ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ, ইসলামী অর্থনীতিবিদ মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম, সাধারণ আলেম সমাজের সভাপতি মুফতি মাছুম বিল্লাহ মাহমুদী, সাধারণ সম্পাদক আকিফ আব্দুল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ আহমাদ, সাবেক কওমি শিক্ষার্থী ও এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেম ফজলুল করীম মারুফ, আল-মারকাজুল ইসলামির চেয়ারম্যান হামজা শহীদুল ইসলাম, সাধারণ আলেম সমাজের যুগ্ম আহ্বায়ক মানযুর হাসান যুবায়ের, মুফতি মিনহাজ উদ্দীন, মুফতি ইমামুদ্দীন, তরুণ চিন্তক রেজাউল করীম আবরার, অনলাইন একটিভিস্ট রুহুল আমিন সাদী, আলী হাসান উসামা, এহসানুল হক, আশরাফ উদ্দীন মাহদী, মুহিউদ্দিন কাসেমী, মনযূরুল হক, ইমরান রাইহান, মাহমুদ সিদ্দিকী, খালিদ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, সানাউল্লাহ খান, মুনতাছির আহমাদ, রিদওয়ান মাযহারী, হাসান ইনাম, রায়হান আলী, জাওয়াদ আহমাদ, মাবরুরুল হক, মোল্লা খালিদ সাইফুল্লাহ, ইউসুফ আম্মার, আবু বকর সিদ্দিক জাবের প্রমুখ এবং সাধারণ আলেম সমাজের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।



