ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

আশ্বাসের পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আরাকান আর্মিকে সক্রিয় হতে হবে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মিয়ানমারের রাখাইন এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সমালোচকদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন ও আক্রমণ এখনো বন্ধ হয়নি। যদিও আরাকান আর্মি জোর দিয়ে বলছে, ভবিষ্যতের রাখাইন জাতি রোহিঙ্গা মুসলিমদের অধিকারকে সম্মান করবে। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আরাকান আর্মির সেই আশ্বাসে এখনো আস্থা রাখতে পারছেন না। যা ইঙ্গিত দেয় যে রোহিঙ্গা সঙ্কট আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ‘বিপর্যয়’ রোধে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কারণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সঙ্কটের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গার তীব্র মানবিক জরুরি সহায়তা ম্লান হয়ে পড়েছে। ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক তহবিলের ঘাটতির কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটের তীব্র অবনতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং বাংলাদেশের মাটিতে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ‘সম্ভাব্য পতন’ রোধে অবিলম্বে বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে, যাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শুরু হওয়া সামরিক ‘নির্মূল অভিযান’ থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছেন। তাদের বেশির ভাগই এখন কক্সবাজার শহরের আশপাশের বিশাল শরণার্থী শিবিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছেন।

গত শুক্রবার জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) এক ভাষণে ইউনূস সতর্ক করে বলেছেন যে মিয়ানমারে চলমান সঙ্ঘাত এবং বৈষম্যের কারণে, ‘রোহিঙ্গা সঙ্কট’ এখনও অব্যাহত রয়েছে, যার কোনো সমাধানের আভাস নেই। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে চলমান সঙ্ঘাত কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই নয়, বরং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।

প্রকৃতপক্ষে, রাখাইন রাজ্যে চলমান সংস্কৃতিগত পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির মূলে থাকা রোহিঙ্গাদের অধিকার বঞ্চিত করা এবং নিপীড়নের কারণে বাংলাদেশ তাদের রক্ষায় ধীর কিন্তু নিয়মিত প্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছে।

ইউনূসের এ ধরনের বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে আরাকান আর্মির প্রতি ইঙ্গিত করে, একটি রাখাইন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী যারা এখন রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যারা রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালানোর এবং এমনকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ করার অভিযোগে অভিযুক্ত। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত এক বছরে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

ড. ইউনূস কক্সবাজারের আশপাশের শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কেও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক দাতাদের তহবিল হ্রাসের ফলে শিগগিরই খাদ্যসহায়তা ‘ব্যক্তি প্রতি মাত্র ৬ ডলারে’ নেমে আসতে পারে। এর ফলে অনেক রোহিঙ্গা তীব্র খাদ্যসঙ্কটে পড়তে পারে, তাদের অপুষ্টি আরো তীব্রতর হতে পারে এবং তারা মরিয়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারেন, পাশাপাশি ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বাড়তে পারে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিদ্যমান দাতাদের আরা আর্থিক সহায়তায় এগিয়ে আসার এবং সম্ভাব্য দাতাদের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি প্রতিরোধে উদার অনুদানের ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

কিছুদিন ধরে ক্যাম্পের পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, কারণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সঙ্কটের ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা সঙ্কট ক্রমশ ম্লান হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (ওওঝঝ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সঙ্কট শুরু হওয়ার পর থেকে ‘সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক সমর্থন হ্রাস এবং ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক ও জঙ্গি কার্যকলাপ বাড়াচ্ছে।

ওওঝঝ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে- শরণার্থীরা বাংলাদেশ সরকারের শাস্তিমূলক নীতির শিকার হচ্ছেন। যা শরণার্থীদের প্রকৃত স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধা দেয়ার জন্য সম্ভবত ব্যর্থ প্রচেষ্টা যা শরণার্থীদের চলাচলের ওপর কঠোর সীমা আরোপ করেছে, তাদের কাজ করতে নিষিদ্ধ করেছে এবং তাদের শিক্ষা বা ভ্রমণ থেকে বিরত রেখেছে। এটি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সিমকার্ড নিবন্ধন করতেও বাধা দিয়েছে এবং শিবিরগুলোতে আরো বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে বাধা দিয়েছে।

গত বছর ড. ইউনূসের সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে, গণবিক্ষোভের সময় শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, বিশ্বকে ‘রোহিঙ্গা সঙ্কট’ ভুলে না যাওয়ার আহ্বানে সোচ্চার ছিলেন এবং বাংলাদেশ এই প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছে। নিউ ইয়র্কে রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ-স্তরের সম্মেলন আয়োজনে ড. ইউনূস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা (যদিও কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী নেই বলে জানা গেছে) অংশ নেবেন। প্রতি বছর স্থায়ী হয়ে উঠছে এমন শরণার্থী সঙ্কট কিভাবে মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে। বক্তৃতায় ড. ইউনূস প্রত্যাশা করেন, আসন্ন সম্মেলন বিশ্বব্যাপী সঙ্কল্পকে শক্তিশালী করবে এবং রোহিঙ্গাদের জন্য সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরি করবে। রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের জন্য বিশ্বব্যাপী গৃহীত রোডম্যাপের অংশ হিসেবে সময়সীমাবদ্ধ অর্জনযোগ্য একটি প্রক্রিয়ায় একমত হতে হবে।

যদিও তহবিলের মাত্রা রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে, রাখাইন রাজ্যে বিদ্যমান জটিল জাতিগত সমীকরণের সমাধান করা এবং ‘রোহিঙ্গাদের প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়া’ উল্টে দেয়া, যেমন ড. ইউনূস জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে বলেছেন, তবুও এমন কিছু বিষয় জড়িত যা সম্ভবত কোনো বিদেশী সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

রাখাইন রাজ্যের প্রধান কর্তৃপক্ষ হিসেবে আরাকান আর্মি কিভাবে কাজ করে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সমালোচকদের দাবি আরাকান আর্মি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্যাতন ও আক্রমণ করেছে। এর জবাবে, আরাকান নেতৃত্ব জোর দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতের রাখাইন জাতি রোহিঙ্গাদের অধিকারকে সম্মান করবে। কিন্তু এজন্য তাদের সক্রিয় হয়ে ওঠার সময় এসেছে।