হরমুজ নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠক স্থগিত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ঢিমেতালের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বহুপক্ষীয় বৈঠক স্থগিত করার কথা গতকাল সোমবার জানিয়েছে ওমান। ইরান আর উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য শক্তিগুলোর মধ্যে গতকাল এ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়িদ বদর আলবুসাইদি গতকাল রোববার রাতে জানান, সোমবারের আঞ্চলিক বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ আপাতত এ বৈঠক হচ্ছে না। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় অদূরভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতার আশা আরো ফিকে হয়ে এসেছে। ইরানের কর্মকর্তারা জানান, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে বৈঠকটিতে তারা অংশ নেবেন। ওই বৈঠকে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল কিভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে ওমানের সাথে করা একটি চুক্তি তুলে ধরার কথা ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ইরানের ফারস নিউজকে বলেন, এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশের অনুরোধে ওমানে অনুষ্ঠেয় বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তেহরান ও মাসকাট যৌথভাবে নিয়েছে। ওমানের সাথে সমন্বয় করে বৈঠকের নতুন তারিখ ঠিক করা হবে। খবর আনাদোলু ও আলজাজিরার।

হরমুজে অত্যাধুনিক মার্কিন ড্রোন ধ্বংসের দাবি ইরানের

হরমুজ প্রণালীর ওপর উড্ডয়নরত একটি উন্নত ‘এমকিউ-১’ ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। গতকাল সোমবার আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের পরিচালিত একটি নতুন ও অত্যাধুনিক বিমান হামলা প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয় বলে নিশ্চিত করে আইআরআইবি। সংস্থাটির এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরানের সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে এই সামরিক অপারেশনটি পরিচালিত হয়েছে। তবে ধ্বংস হওয়া ড্রোনটি কোন দেশের বা কাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছিল সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ইরানের ‘কালো তালিকায়’ ৭৭ জাহাজ

হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। দেশটির পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ হরমুজ প্রণালীর নিয়ম ও প্রটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগে ৭৭টি জাহাজের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকাভুক্ত এসব জাহাজ ভবিষ্যতে প্রণালীটি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট অনুরোধ ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত এই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে জরিমানা, আটক কিংবা জাহাজ জব্দ করার মতো ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নির্ধারিত নিয়ম ও প্রটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব জাহাজকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাথে সহযোগিতা করছে- এমন বাণিজ্যিক জাহাজকেও ভবিষ্যতে এই তালিকায় যুক্ত করা হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান।

ইরানের তেল নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানে থেকে যেতে পারে এবং দেশটির তেল মার্কিন ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি ভেনিজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের এক-পঞ্চমাংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া উদ্যোগের সাথে তুলনা করেন। আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে বৈঠক করার পাশাপাশি গলফ খেলা দেখতে গিয়ে ট্রাম্প আবারো বলেন, তিনি এখনো আশা করছেন- চলতি বছরেই ইরানের যুদ্ধ শেষ হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। আইরিশ ওপেন গলফ চ্যাম্পিয়নশিপে বক্তব্য দেয়ার সময় ট্রাম্প আরো বলেন, ইরানের যুদ্ধ শেষ হলে পেট্রলের দাম ‘পাথরের মতো দ্রুত’ পড়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় তেলের বাজারেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি শুধু ‘সঠিক চুক্তি’ করবেন। কোনো চুক্তি ‘ভালো না হলে’ তিনি তা করবেন না। তিনি আরো দাবি করেন, ইরান শান্তি আলোচনা করতে ‘প্রতিনিয়ত’ যোগাযোগ করছে। তবে এর আগে তেহরান ট্রাম্পের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এবার ট্রাম্প ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আরেকটি সম্ভাবনার কথাও সামনে এনেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি আগস্টে ঘোষিত ভেনিজুয়েলা-সংক্রান্ত মার্কিন চুক্তির উদাহরণ দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমরা ইরান থেকে বের হয়ে আসব, যদি না আমরা সেখানে থেকে গিয়ে ভেনিজুয়েলার মতো তেল নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত নিই।’ তিনি আরো বলেন, ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে রাজস্ব পেয়েছে, তা দিয়ে ‘অনেকবার’ যুদ্ধের খরচ মেটানো সম্ভব হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সাথে ইরানের বিরোধ

হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিরোধ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।

তবে ইরান বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তেহরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে দাবি করছে তা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী নিয়ে দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালী খুলবে না ইরান

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান বিরোধের অবসান এবং নিজেদের কয়েকটি দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেয়ার প্রশ্নে তারা সম্মত নয়।

তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ, যুদ্ধ বা ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এসব বিষয়ে সমাধান না হলে প্রণালীটি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু না করার বিষয়ে ইরান অনড় অবস্থানে রয়েছে। নতুন করে ৭৭টি জাহাজের তালিকা প্রকাশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাথে সহযোগিতাকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত করার হুমকি সেই অবস্থানকেই আরো স্পষ্ট করেছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাড়ছে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রফতানির বড় একটি এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়। ফলে প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজকে জরিমানা, আটক বা জব্দ করার মতো পদক্ষেপ নেয়া হলে জাহাজের মালিক, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের সর্বশেষ পদক্ষেপ তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের অংশ নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এমন একসময়ে নতুন মাত্রা পেল, যখন প্রণালীটির ভবিষ্যৎ নিয়েই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। এক দিকে ওয়াশিংটন জলপথটির ওপর নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে, অন্য দিকে তেহরান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের শর্তে প্রণালীর কার্যক্রম পরিচালনার অবস্থান নিয়েছে। ৭৭টি জাহাজের নতুন তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে ইরান কার্যত জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নিজেদের নির্ধারিত নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে তারা প্রস্তুত। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাথে সহযোগিতাকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার সতর্কবার্তা ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে আরো অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

ঝুঁকিতে আরব দেশগুলো

হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের পথ যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে ইরানের সাথে নতুন কোনো সমঝোতায় যেতে হতে পারে। কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের বর্তমান অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সাথে সংশ্লিষ্ট সামরিক জাহাজগুলোকে আগের মতো অবাধে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের সুযোগ দেয়া হবে না। তার মতে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে নতুন ধরনের একটি ব্যবস্থা মেনে নিতে হবে, কারণ অবরোধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মূল্য তাদেরই দিতে হচ্ছে। বারাকাত বলেন, আরব দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ রফতানি বর্তমানে বাধাগ্রস্ত। আন্তর্জাতিক বাজার তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার জন্য অপেক্ষা করছে না; বরং বাজার ইতোমধ্যে বিকল্প পথ ও সরবরাহব্যবস্থা খুঁজে নিচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সঙ্কট দেখা দেয়নি বলে জানান তিনি। তার মতে, হরমুজসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘœ ঘটলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উভয়ই আরো বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।