নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্তোষ ও সমালোচনা- দুই ধরনের মতই এসেছে একটি গোলটেবিল আলোচনায়। আলোচকরা বলেছেন, ছয় মাসে সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, দুর্নীতি দমন, জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারে সরকারের অগ্রগতি এখনই দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের ১৮০ দিন পর্যালোচনা : সুশাসন, জবাবদিহি ও উন্নয়নের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। সিটিজেনস’ ফোরাম, বাংলাদেশ (সিএফবি) ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ইনিশিয়েটিভস (বিসিএআই) যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে।
আলোচনায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ছয় মাসের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কৃষক, নারী, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন কার্ড, ঋণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। প্রায় ২৪ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া এক বছর থেকে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের কথাও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া ১৩তম জাতীয় সংসদের ৫২ কার্যদিবসে ১০৫টি বিল পাস এবং প্রধানমন্ত্রীর মাসিক মূল বেতনের ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৫০০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়াকে সরকারের মিতব্যয়িতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও সিএফবির প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। একই সাথে দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত সমস্যার দায়ও বর্তমান সরকারের ওপর পড়ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনাগত ঘাটতি সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দিতে একটি ‘শ্যাডো’ পরিকল্পনা প্রকাশের পরামর্শ দেন তিনি। তার ভাষায়, সরকার আন্তরিকভাবে কাজ শুরু করেছে; এখন প্রয়োজন ফলাফল দেয়ার জন্য সময় এবং সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগত বাস্তবায়ন। সংসদকে নীতিনির্ধারণের মূল কেন্দ্রে পরিণত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নতুন সরকারের মাত্র ছয় মাসে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তার মতে, ৫৫ বছরের সংসদীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের স্থবিরতা থেকে দেশ নতুন গতিমুখ নির্ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, ১৮০ দিনে সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা খুব তাড়াতাড়ি হবে। তবে সরকারের গতিমুখ সঠিক কি না এবং সেই গতিমুখে গতি সঞ্চারিত হচ্ছে কি না- এ দু’টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অচল অর্থনীতি ও লুটপাটের উত্তরাধিকার সামাল দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বিরোধী দলকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় গঠনমূলকভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ‘কিছু না করার বছর’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আইআরআইয়ের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকরা সরকারকে আরো কিছুটা সময় দিতে প্রস্তুত। সরকার ও বিরোধী দল ক্যামেরার বাইরে বসে সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা করলে জনগণের আস্থা বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, মাত্র ১৮০ দিনে একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না। অনেক কিছুই লিখিত আইনের পাশাপাশি রাজনৈতিক কনভেনশন ও শিষ্টাচারের ওপর নির্ভর করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার আচরণে তিনি সেই শিষ্টাচারের কিছুটা প্রতিফলন দেখেছেন বলে জানান।
দেশকে শুধু প্রকল্পনির্ভর না রেখে ‘এনেবলিং স্টেট’-এ রূপান্তর, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের ভোগান্তি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আলোচকরা।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরীন পারভীন হক বলেন, সরকারের নেয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে আরো বেশি জানাতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাজারে গিয়ে অনেক সময় মানুষ খালি ব্যাগ নিয়ে ফিরছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মন্তব্য, ‘দুর্নীতি এখন প্রায় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।’ ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং বৈষম্যবিরোধী আইনের দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান আমলাতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ক্ষমতা ও অর্থের আকর্ষণে মেধাবীদের পুলিশ-প্রশাসনমুখী প্রবণতা একটি সামাজিক ব্যাধি। নাগরিক ও নৈতিক শিক্ষা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সাফল্য কোনো এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি দলগত কাজ। নীতিনির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আরো বাড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি।
নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনকে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মানবসম্পদের রূপান্তর ঘটাতে পারলে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম আমানুল্লাহ শিক্ষা খাতে স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সাথে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম সংসদে সুস্থ আলোচনা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থবহ নয়। দুর্নীতিতে শূন্য সহনশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং অর্থ পাচার বন্ধে গুরুত্ব দেন তিনি।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দার সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন’কে প্রথম ১৮০ দিনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সাথে পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও আমলাতন্ত্র সংস্কারে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ থার্ড টার্মিনাল ও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বড় ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়া এবং অর্থনীতিকে আরো উন্মুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। সাবেক সচিব আবদুর রশীদ বলেন, সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
আলোচনা সঞ্চালনা করেন চিকিৎসক অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ। তিনি ১৩ লাখ কৃষকের কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দ্বিগুণ করা, দুই লাখ শিশুকে বিনামূল্যে স্কুল পোশাক এবং ২২ লাখ শিশুকে ফুটবল কর্মসূচির আওতায় আনার মতো উদ্যোগ তুলে ধরেন। একই সাথে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো জরুরি সেবায় জনভোগান্তি কমাতে সরকারের বাড়তি মনোযোগের আহ্বান জানান।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও বিলিয়ার চেয়ারম্যান ড. বোরহান উদ্দিন খান, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সাবেক উপাচার্য মেজর জেনারেল মো: মোশফেকুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি সেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মাজহারুল হক পিপিএম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: তানভীর হাবিব জুয়েলসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আয়োজকরা জানান, সুশাসন, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে অবহিত জনআলোচনা এগিয়ে নেয়ার ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়েছে।



