চীন-রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে মধ্য এশিয়ায় নজর ট্রাম্পের

Printed Edition
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিফাইভ+ওয়ান মধ্য এশীয় দেশগুলোর নেতাদের সাথে নৈশভোজে : ইন্টারনেট
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিফাইভ+ওয়ান মধ্য এশীয় দেশগুলোর নেতাদের সাথে নৈশভোজে : ইন্টারনেট
  • খনিজ সম্পর্ক জোরদারে মধ্য এশিয়ার নেতাদের সাথে বৈঠক
  • চীন-রাশিয়ার সাথেও সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পাঁচটি দেশ
  • যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ খনিজ জ্বালানি এবং বাণিজ্যে অংশীদারিত্ব চায়

রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। বৈঠকে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অংশ নেন কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্টরা।

এই পাঁচ দেশকে নিয়ে গঠিত ‘সিফাইভ+ওয়ান’ ফোরাম ২০১৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। তবে এবারের বৈঠককে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও মধ্য এশিয়ার নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তারা বহুপাক্ষিক কূটনীতির নীতিতে বিশ্বাসী এবং চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করি, যেখানে সব অংশীদারের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হয়।’ ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে মধ্য এশিয়া এখন একটি কৌশলগত অগ্রাধিকারের অঞ্চল, যেখানে চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে এই অঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ ও ঋণসহায়তা দিচ্ছে, অন্য দিকে রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবে এই দেশগুলোর সাথে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চায়, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো যেন কেবলমাত্র চীন বা রাশিয়ার ওপর নির্ভর না করে, বরং একটি বিকল্প কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনা করে। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আমরা মধ্য এশিয়ার সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অঞ্চল আমাদের জন্য শুধু নিরাপত্তার দিক থেকে নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো গভীর করতে চায় বলে জানান।

এই সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এই সমঝোতার লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও শিল্প উৎপাদনে অত্যাবশ্যকীয় ধাতু- যেমন লিথিয়াম, টাংস্টেন, নিকেল ও রেয়ার আর্থ ধাতুর সরবরাহ শৃঙ্খলা নিরাপদ রাখা। উচ্চ প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে এসব খনিজের ব্যবহার বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী উৎস তৈরি করা এখন জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার। এই প্রেক্ষাপটে মধ্য এশিয়া অঞ্চলকে ‘নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি খনিজ সরবরাহ সহযোগী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আরো ছিল সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ, যেখানে তারা মধ্য এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। তবে এই অঞ্চলের দেশগুলো সাধারণত বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে। এই বৈঠক শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।