পুঁজিবাজার সূচকের হঠাৎ উল্লম্ফন

দাম বেড়েছে ৮৫ শতাংশ কোম্পানির

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ধারাবাহিক পতনের মধ্যে থাকা পুঁজিবাজারে হটাৎ উল্টো আচরণ প্রত্যক্ষ করলেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল বুধবার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। বিবদমান দুই পক্ষের কিছু কিছু বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করেছে যে যুদ্ধ আর খুব বেশি দীর্ঘায়িত হচ্ছে না। আর এতেই পুঁজিাবজারগুলোর এই উল্টো আচরণ। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে ধারাবাহিক দরপতন ঘটলেও অংশগ্রহণ বাড়তে থাকা প্রমাণ করছিল যেকোনো মুহূর্তে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় রয়েছে। আর এদিকে যুদ্ধ নিয়ে বিবদমান দুই পক্ষের বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রাসী করে তুলেছে।

গতকাল লেনদেনের শুরুতেই দুই পুঁজিবাজার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কোনো ধরনের বিক্রয়চাপ না থাকায় সূচকের উন্নতি ঘটতে থাকে সাবলীলভাবে। প্রথম দুই ঘণ্টায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি ৯০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পায়। এ সময় উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই দাম বাড়ছিল। তবে বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় বরাবরের মতোই সূচকের উন্নতিতে বড় অবদানটি ছিল ব্যাংক ও বীমা খাতের। এ দুই খাতে প্রায় শতভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। একই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৯৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ১৭৮ দশমিক ৩১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৭২ দশমিক ৭৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৬২ ও ১২ দশমিক ২৫ পয়েন্ট। একইভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ২০৫ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২০৭ দশমিক ৮৪ ও ১২১ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট। এভাবে তিন দিন টানা পতনের পর গতকাল দুই পুঁজিবাজার সূচকের উন্নতির মুখ দেখে।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও উন্নতি ঘটে। গতকাল ৭১৯ কোটি টাকার লেনদেন হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৪ কোিিট টাকা বেশি। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৬৮৫ কোটি টাকা। তবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন সামান্য কমলেও অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ভালো পারফর্ম করলে বরাবরের মতো সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বাজারের সাথে যুক্ত করেন। গত কয়েক দিন ধরে লেনদেনের যে ধারাবাহিকতা তা প্রমাণ করছিল বিনিয়োগকারীরা একটি ভালো সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন। এখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের এ উত্তেজনা হ্রাস পেলে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।

এ দিকে গতকাল বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের তিন দিনে যেসব খাতে বেশি দরপতনের ঘটনা ঘটেছে সেসব খাতেই দর বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ব্যাংক ও বীমা খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি গত কয়েক দিনে ব্যাপকভাবে দর হারায়। এগুলোর মধ্যে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক। গতকাল মূলধনসমৃদ্ধ এ তিনটি ব্যাংকেরই বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে যা দিনের সূচককে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। তা ছাড়া বীমা খাতে ৯০ শতাংশের বেশি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। তা ছাড়া অন্য খাতগুলোর কয়েকটিতে দাম বাড়ে শতভাগ কোম্পানির। সবমিলিয়ে দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর ৮৫ শতাংশই উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়।

তবে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের যে আচরণ তাতে পরিবর্তন আনার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে হলে নানা ধরনের গুজব ও দ্রুত বড়লোক হওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের পুঁজিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হলে বিভিন্ন হাউজে চাউর হওয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া অসমর্থিত কিছু তথ্যের চাইতে কোম্পানির মৌলভিত্তিকেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারের লেনদেনে ও মূল্যবৃদ্ধিতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ভিত্তির কোম্পানিগুলোকেই এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এটি প্রকারান্তরে বাজারের বিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই বাজারের স্বাভাবিক আচরণ ধরে রাখতে চাইলে বিনিয়োগকারীদের যৌক্তিক আচরণের বিকল্প নেই।

ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। ২২ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬ লাখ ৭৮ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২২ কোটি ৩০ লাখ টাকায় ৪৪ লাখ ২৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, একমি পেস্টিসাইডস, সিটি ব্যাংক, সিমটেক্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, হাক্বানি পেপার অ্যান্ড পাল্প, ব্র্যাক ব্যাংক ও সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স।

ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের সিলভা ফার্মা। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৯ দশমিক ৮৯ শথাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সাধারণ বীমা খাতের বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এপেক্স স্পিনিং, ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্স ইনকাম ফান্ড, আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার কেমিক্যালস, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ও পিইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।

মঙ্গলবারের মতো গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ কোম্পানির তালিকায় বেশ কয়েকটি ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সরকার কর্তৃক বন্ধ করার ঘোষণায় ধারাবাহিকভাবে দর হারাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। গতকাল এ তালিকার শীর্ষে ছিল ফার ইস্ট ফিন্যান্স। ১০ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। একই পরিমাণ দর হারিয়ে পিপলস লিজিং ছিল দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং, এফএএস ফিন্যান্স, এসকে ট্রিমস, প্রাইম ফিন্যান্স, নর্দার্ন জুট, এস আলম কোল্ডরোল স্টিলস ও বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম।