ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম গণ-অভ্যুত্থানে গুলিতে হারিয়েছেন এক পা, তার শরীরজুড়ে বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। চোখের সামনে পুলিশের গুলিতে সহযোদ্ধাদের মরতে দেখেছেন জিয়াউর রহমান। নির্বিচার ওই গুলির মুখে নিজের বেঁচে থাকাটাই অলৌকিক মনে করেন তিনি। একই রকম স্মৃতি কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী তাওহীদের। সেই ভয়াল জুলাইয়ের দুই বছর পর তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন ম্লান করার দায় নিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। এত মাইর, এত কষ্ট কেন আমরা নিয়েছিলাম? কেন এত কিছু সহ্য করছিলাম? সবাই আখের গোছাতে ব্যস্ত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের খেলায় আমরা শুধু বলি হয়ে গেলাম। খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার মানে নিত্যপণ্যের দাম নাগালে থাকা তা আর হলো কই? গণতান্ত্রিক ধারায় সমালোচনা করলেও নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তাহলে সুস্থ রাজনীতির যে স্বপ্ন সেটি কই? তাদের মতে, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল যে শক্তি, দুই বছর পর কেন তাদের মধ্যে বিভক্তির সুর? কেন রাজপথ, শিক্ষাঙ্গন আবার সঙ্ঘাতের দিকে যাচ্ছে?
সূত্র মতে, গণভোট মেনে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, দেশজুড়ে চাঁদাবাজি, দখল, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এ সঙ্কট নিরসনে দুই দলের মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ জরুরি হলেও তার কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না; বরং দল দু’টির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। এমন পরিস্থিতি রাজনীতির জন্য অশনিসঙ্কেত বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটলে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজধানীসহ সারা দেশে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে মানুষের জানমালের ক্ষতি হওয়া ছাড়াও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রকাশিত জুলাই মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে ১৬৪ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া জুন মাসে ৫৮টি সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহন হন। জুলাইয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৪টি ঘটনায় দুইজন নিহত এবং ৪৮ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ছয়টি ঘটনায় ৪৪ জন আহত হন। বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষের পাঁচটি ঘটনায় ৩৮ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হন। এ ছাড়া সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজির ৯টি ঘটনায় ৪০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ৯টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ২০ জন আহত হয়েছেন। অন্তত আটটি ঘটনায় আটজনকে আটক ও আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও রাষ্ট্রসংস্কারের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যেখানে রাজনীতিতে নতুন দ্বন্দ্ব এবং রাজপথে সঙ্ঘাতের আশঙ্কা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নেয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ, জাতীয় চার্টার বা রোডম্যাপের বাস্তবায়ন এবং আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে গণভোটের রায় এবং জন-আকাক্সক্ষার সাথে প্রতারণা করেছে। সরকার গণভোটের রায় উপেক্ষা করে দেশকে নতুন করে রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোট গণমিছিল ও সমাবেশ করে যাচ্ছে। সমাবেশ থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি সঙ্কট নিরসন, নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং সংবিধান সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে ‘হুঁশে ফিরে’ এসে সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। গণভোটের রায় যদি না মানে, তা হলে এই সরকারকে আমরা সে দিন থেকেই অবৈধ সরকার বলা শুরু করব। আমরা এটার জন্য সময় নেব না।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অ্যধাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে জন-আকাক্সক্ষার সাথে প্রতারণা করেছে বিএনপি। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে অবস্থান। তিনি বলেন, সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়- এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তিনি আরো বলেন, একবারো কোনো মন্ত্রী বলেননি, গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানেন, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে। তিনি বলেন, সরকারের বর্তমান অবস্থানে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা স্পষ্ট। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। তিনি সতর্ক করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আবারো সঙ্ঘাত, অস্থিরতা ও রক্তপাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হবে সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ যেকোনো রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় বিরোধী দলকে সাথে নিয়েই সরকার কাজ করতে চায়। গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে বিরোধী দলকে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে; কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মতো বক্তব্য দিতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের যেসব প্রস্তাব দিয়েছে তা সংসদে আলোচনা হবে। রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবে সেটি হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। বিরোধী দলগুলোর প্রতি অনুরোধ করে তিনি বলেন, আপনারা সরকারকে সময় দেন, সুযোগ দেন যাতে সরকার প্রতিশ্রুতি কাজগুলো করতে পারে। মাত্র পাঁচ মাস কয়েকদিন হয়েছে। এর মধ্যে যদি সবকিছু সঠিকভাবে চাই, এটা সম্ভব না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও অসুস্থ ধারার রাজনীতির পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাস্তায় নেমেছিল সাধারণ মানুষ। দুই বছর পর সে স্বপ্নের কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে এটি এখন বড় প্রশ্ন।



