গালফ নিউজ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের চলমান তীব্র সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি প্রশমিত করতে মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। চলতি বছরে এটি তার তৃতীয় ইরান সফর। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কৌশলগত অচলাবস্থা নিরসনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই এ সফর শুরু হলো।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই আসিম মুনিরের এ সফর। সফরকালে তিনি ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বৈঠক করবেন। এ সফরের ঠিক আগেই ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির তেহরান সফরের খবর আসে, এবং ওমান-ইরান আলোচনার পাশাপাশি আজ আসিম মুনিরের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে চার দিনের ব্যবধানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে টেলিফোনে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন পাক সেনাপ্রধান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা সফরটির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নতুন প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন সচিবসহ চলতি মাসে নিযুক্ত ইরানের নতুন সামরিক নেতৃত্বের সাথে মুনিরের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।
সফরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্ঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের লাল সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ১১ আগস্ট বাব আল-মানদেব প্রণালীতে হাউছিদের হামলায় তানজানিয়ার পতাকাবাহী জাহাজে থাকা তিন পাকিস্তানি নাবিক প্রাণ হারান, যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল ইসলামাবাদ। এ ছাড়া সম্প্রতি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসবে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মধ্যস্থতা এখন বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছে। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে’র ৬০ দিনের মেয়াদ আগস্টের মাঝামাঝিতে শেষ হলেও কোনো পক্ষই তা বাড়ায়নি। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল খাতের নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের তহবিল মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হবে না। অন্য দিকে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর এ যাবতকালের কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চূড়ান্ত অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যাকে তেহরান ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের কাছেই পাকিস্তান একটি অনপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মাধ্যম। তবে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, মূল রাজনৈতিক মধ্যস্থতা কাতারই করছে; পাক সেনাপ্রধান মূলত ইরানের প্রভাবশালী সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে মার্কিন প্রস্তাব ও বার্তার আদান-প্রদান নিশ্চিত করছেন।
রেকর্ড দরপতন রিয়ালের
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোরতর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কা এবং কূটনৈতিক আলোচনা থমকে যাওয়ার জেরে অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ইরান। গতকাল রোববার দেশটির মুক্তবাজারে স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের মান এযাবৎকালের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। তেহরানের উন্মুক্ত বাজারে প্রথমবারের মতো এক মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ রিয়ালে (বা দুই লাখ তুমান)।
মুদ্রাবাজারের তথ্য সংস্থা শাফাক ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা যায়, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিয়ালের বিপরীতে ডলারের মূল্য সাত শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি মুদ্রা বাজারে কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ থাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করছেন, যা ইরানি অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দরবৃদ্ধির আশঙ্কায় জনমনে অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে।



