যাদের ত্যাগে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ

কয়েকশ’ লাশের স্তূপে খোঁজ মেলে আব্দুল জব্বারের

Printed Edition
কয়েকশ’ লাশের স্তূপে খোঁজ মেলে আব্দুল জব্বারের
কয়েকশ’ লাশের স্তূপে খোঁজ মেলে আব্দুল জব্বারের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ঢাকার তেজগাঁও পশ্চিম নাখালপাড়া এলাকায় আব্দুল জব্বারের জন্ম। পরিবারসহ বাড্ডা এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করে পরবর্তীতে তিতুমীর কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিয়মিত ইসলাম চর্চা করতেন। স্বেচ্ছায় ইসলাম বহির্ভূত কোনো কাজ করতেন না।

আব্দুল জব্বার স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশে একদিন কুরআনের শাসন চালু হবে। সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটবে। ইসলামী আন্দোলনের সক্রিয় একজন কর্মী ছিলেন। পেশায় বিক্রয়কর্মী ছিলেন। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। ভেবেছিলেন তাদের জন্য ঢাকাতে কোথাও অল্প কিছু জমি কিনে বাড়ি করবেন। এ জন্য বিদেশ যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এমন এক না ফেরার দেশে চলে গেলেন যে তার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে আব্দুল জব্বার নিজ কর্মস্থল থেকে বাসায় চলে আসেন। তার চিন্তা ছিল ওই সময় বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহযোগিতা করবেন ও মিছিলে অংশ নেবেন। কর্মস্থলে তার মন টিকছিল না। দুপুরের পর হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে তিনি পরিবারসহ রাস্তায় নেমে আসেন। হাসিনার পতন নিশ্চিত হওয়ার পরও বাড্ডা থানার পুলিশ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মেতে ওঠে। মানুষ দেখামাত্রই তারা গুলি করে। বাসায় ফিরলেও আসরের নামাজ পড়ে আব্দুল জব্বার ফের রাস্তায় বের হলে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেলের আঘাত পেয়ে আহত হয়ে বাড়ি ফেরেন। স্ত্রীকে বলেন সামান্য আহত হয়েছেন কোনো সমস্যা নেই।

বাড়িতে ফোন রেখে মাগরিবের নামাজ পড়তে বের হন জব্বার। ভেবেছিলেন তখন হয়তো কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু মাগরিবের নামাজ পড়ে যখন রাস্তায় বের হন। তখনো পুলিশ চারদিক থেকে গুলি করছিল। কয়েক শ’ পুলিশ একসাথে চারপাশ থেকে গুলি চালাতে থাকে। আব্দুল জব্বার বিভিন্ন মানুষের সাথে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হঠাৎ একটি বুলেট এসে পেটে বিদ্ধ হলে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। আশপাশের মানুষ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ঘণ্টাখানেক পর আব্দুল জব্বার মারা যান।

এ দিকে বাইরে ভয়াবহ পরিস্থিতি জানতে পেরে স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম সুমী স্বামীর খোঁজে বের হন। বাইরে বের হয়ে দেখেন চার থেকে পাঁচটা লাশ তখনো রাস্তায় পড়ে আছে। তাদের চেহারার সাথে তার স্বামীর চেহারার মিল না পেয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে থাকেন সুমী। এভাবে রাত ৩টা বেজে যায়। অবশেষে ফজরের নামাজ শেষে দেবরকে সাথে করে ফের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। হাতে জব্বারের একটি ছবি। মর্গে গিয়ে লাশের স্তূপে খুঁজতে থাকেন প্রিয় স্বামীর মুখ। সেখানে তিনি কয়েক শ’ লাশের মাঝে খুঁজে পান আ: জব্বারকে। নিথর দেহ পড়ে আছে। অথচ একদিন আগেও জব্বার তার ছেলেমেয়ের সাথে কথা বলেছেন। সান্ত্বনা এতটুকু সুমীর, স্বামী সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং সত্যের পথে থেকেছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।