কাজী জহিরুল ইসলাম
আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমি একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করতাম, সেটির নাম ছিল সেইভ দ্য চিলড্রেন ইউকে। আমি প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। নানান রকমের বিল আসত, প্রতিষ্ঠানের আইনকানুন দেখে সেসব ছাড়তাম। একদিন আমাদের একজন পরিচালক বলেন, শুধু আইন দেখলেই হবে না, আপনাকে প্রতিষ্ঠানের প্রথাও দেখতে হবে। আমি তাকে বলি, আইনসিদ্ধ নয় এমন কাজ যদি বছরের পর বছর ধরে চলে, আমি সেটি বন্ধ করতে চাই। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, প্রথা হচ্ছে অলিখিত আইন, আইনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা আদালতেও গ্রহণযোগ্য। কথাটি আমার একদমই পছন্দ হয়নি। তরুণ বয়স, পৃথিবী থেকে সব অনিয়ম ধুয়ে মুছে দূর করে দেয়ার প্রতিজ্ঞা তখন চোখে মুখে। তবে ‘প্রথা আদালতেও গ্রহণযোগ্য’ কথাটিতে আমার খটকা লাগে।
যেহেতু বিষয়টি আমার মনের মধ্যে খচখচ করছিল একদিন সুযোগ বুঝে প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি প্রধান ব্রিটিশ নাগরিক সায়মন মলিসনের কাছে প্রসঙ্গটা তুলি। তিনি ছিলেন দার্শনিক ধরনের মানুষ। আজ থেকে ৩০ বছর আগেই তিনি ‘টেলিকমিউটিং’ বা ওয়ার্কিং ফ্রম হোম ধারণা চালু করেছিলেন। আমাদের বেশ কয়েকজন অফিসার তখন প্রায়শই বাসা থেকে কাজ করতেন। বিষয়টিকে আমরা, যারা রোজ অফিসে যেতাম, খুব বাঁকা চোখে দেখতাম। শুধু টেলিকমিউটিংই না, আমি তার কাছেই প্রথম ৩৬০ ডিগ্রি পারফরম্যান্স রেটিংয়ের ধারণাটি জানতে পারি। কোনো এনজিও তো নয়ই, জাতিসঙ্ঘও তখন এসব ধারণার জন্ম দেয়নি। ৩৬০ ডিগ্রি হচ্ছে একজন ম্যানেজারের বার্ষিক পারফরম্যান্স রেটিং করবে তার সুপারভাইজার, কো-ওয়ার্কার এবং অধীনস্থ কর্মীরা। এই পদ্ধতি মাত্র কয়েক বছর আগে সীমিত আকারে জাতিসঙ্ঘ চালু করেছে।
সায়মন আমার প্রশ্নটা শুনে মিটমিট করে হাসছেন। ওর ঠোঁটে এবং গালে হাসি ছড়িয়ে পড়লেও চোখের দৃষ্টি তীব্র ও অনড়। ওর নীল চোখ দু’টি ধারালো বর্শার মতো বিদ্ধ হয়ে আছে আমার চোখের ওপর। আমি অস্বস্তি বোধ করি। আমাকে কোনো উত্তর না দিয়ে সায়মন বরং পাল্টা প্রশ্ন করেন-
প্রথা সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? আমি বলি, প্রথা যদি আইনসিদ্ধ না হয় তাহলে পরিত্যাজ্য।
এবার তিনি খুব শান্ত গলায় বলেন, না, প্রথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথা থেকেই আইন তৈরি হয়। যেমন কল্পনা থেকে বিজ্ঞানের অনেক আবিষ্কার হয়েছে, সেইরকম। তবে সমাজে অনেক মন্দ প্রথা আছে, সেগুলো আমরা পরিহার করব, ভালো প্রথা গ্রহণ করব, এর সপক্ষে আইন থাকুক বা না থাকুক।
সায়মনের সায় পেয়ে আমিও নমনীয় হই এবং সামাজিক প্রথাকে কখনোই আর আগের মতো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেই না।
অনেক দিন পরে ইংরেজ কবি পার্সিবিশি শেলির একটি উক্তির সাথে পরিচিত হই। তিনি বলেন, Poets are the unacknowledged legislators of the world. কথাটির বাংলা করলে দাঁড়ায়- কবিরা হচ্ছেন পৃথিবীর অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা। এর মানে কী? মানে হচ্ছে কবিরা সামাজিক প্রথা তৈরি করেন। কবিতাই পৃথিবীর আদি সাহিত্য। পৃথিবীর প্রথম সাহিত্য রচনা করেছেন মেসোপটেমিয়ার কবি এনহেদুয়ানা, সেটি ছিল চন্দ্রদেবি ইনানার স্তুতিকাব্য। বিশ্বসাহিত্যে স্বীকৃত প্রথম গ্রন্থের নাম গিলগামেশ, সেটিও কবিতা। প্রায় একই সময়ের গ্রন্থিত তওরাত, সেটিও কবিতার অনুরূপ, এর ঠিক অল্পকাল পরে ভারতে রচিত প্রথম গ্রন্থ বেদও কবিতা। এইসব গ্রন্থসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রচিত আরো হাজারো গ্রন্থে রচিত স্লোকগুলো, পঙক্তিগুলো দেশে দেশে তৈরি করেছে বহু সামাজিক প্রথা। আমরা কী বড়ু চণ্ডিদাস, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে নানান সুপরামর্শ হরহামেশাই দিচ্ছি না। আমরা কী প্রায়শই মদন মোহন তর্কালঙ্কারের ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ বলে সন্তানকে সৎপথে চলার পরামর্শ দিচ্ছি না।
ধর্মগ্রন্থে, কবিতায় বর্ণিত সেসব প্রথা থেকে নানান দেশের পার্লামেন্টে গৃহীত হয়েছে রাষ্ট্রগুলোর বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন। কাজেই সামাজিক প্রথা, যা একটি জনপদের মানুষ বহু বছর ধরে মেনে আসছে, শুধু আইনে নেই, এই দোহাই দিয়ে তাকে অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই। জাতিসঙ্ঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে সেসব দেশের স্থানীয় সংস্কৃতি, আচার, প্রথা মেনে চলে।
এত বড় একটি ভূমিকা করলাম যে কথাটি বলার জন্য তা হচ্ছে ‘কবিতা’। হ্যাঁ, কবিতার মর্যাদা অতি উচ্চ পর্যায়ের। আমাদের দেশের মানুষ কবিতাকে শুধু আবেগের বাহন হিসেবেই বিবেচনা করেন, এর গুরুত্ব অনুধাবন করে কবিতাকে এবং কবিকে যথাযথ মর্যাদা দেন না। অবশ্য কবিরাও অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের মর্যাদা নিজেরাই বুঝতে পারেন না, প্রায়শই দেখি সামান্য অর্থ, চাকরি, পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় সম্মান, পদোন্নতি, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ ইত্যাদির কাছে কবিরা নিজেদের আত্মমর্যাদা বিক্রি করে দেন।
আমি যখন ঢাকাস্থ জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিলে কাজ করতাম, আমাদের কান্ট্রি প্রধান ছিলেন ভারতীয় এক নারী, সুনিতা মুখার্জি। তিনি যখনই কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রাখতেন, অফিসে বা অফিসের বাইরে, তা শুরু করতেন কোনো কবিতা দিয়ে এবং শেষও করতেন কবিতা দিয়ে। প্রায়শই আমাকে তিনি বক্তব্যের বিষয়-উপযোগী কবিতা খুঁজে দিতে বলতেন। কয়েক বছর আগে একজন মার্কিন শ্বেতাঙ্গ বয়স্কা নারী আমার নিউ ইয়র্কের অফিসে এসেছিলেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায় তিনি শুরু করেছেন একটি বা দু’টি কবিতার পঙক্তি দিয়ে। আমার কাছ থেকেও আমার লেখা একটি কবিতার দু’টি পঙক্তি সংগ্রহ করেন এবং তা গ্রন্থে ব্যবহারের অনুমতি নেন।
২০২২ সালের নভেম্বর মাস। আমার ছেলের বিয়ের ফর্মাল অনুষ্ঠান। কনেপক্ষ আইরিশ আমেরিকান, ওরা খ্রিষ্টান। প্রথমে আমাদের এখানে ইসলাম ধর্মমতে গায়ে হলুদ এবং বিয়ে হয়। পরে নিউজার্সির একটি ওয়েডিং সেন্টারে যৌথ অনুষ্ঠান। যেহেতু ওদের সংস্কৃতির সাথে আমাদের ভালো জানাশোনা নেই, আগে থেকেই আমাদের সব জানিয়ে দেয়া হচ্ছিল কেমন হবে পুরো অনুষ্ঠানটি। বিয়ে পড়ানোর ঠিক আগ মুহূর্তে ছেলের মাকে একটি কবিতা পড়তে হবে। কবিতা ঠিক করে আগে থেকেই আমার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেয়া হলো। বেশ আবেগময় কবিতা। পরে ব্রিজিতের অনেক আত্মীয় এসে আমার স্ত্রীকে বলেছে, কবিতা শুনে আমি আনন্দে কেঁদেছি। এটিই হলো কবিতার শক্তি। বিয়ের সুশৃঙ্খল এবং আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে থাকছে কবিতা পাঠ, তাও পাদ্রির মন্ত্রপাঠের ঠিক আগে। কবিতার কী উচ্চ মর্যাদা।
২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি যারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অভিষেক অনুষ্ঠানটি দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে- এত হাই-প্রোফাইল একটি অনুষ্ঠানে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী কবিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কবিতা পড়ার জন্য। আমান্দা গরমেন সেই অনুষ্ঠানে ‘দ্য হিল উই ক্লাইম্ব’ শিরোনামের একটি কবিতা পড়ে অনুষ্ঠানের শৈল্পিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন, একই সঙ্গে কবি ও কবিতার মর্যাদা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অবস্থানে উন্নীত হয়েছিল।
আসলে এই লেখাটি লিখতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে ২০২৬ সালের প্রথম দিন নিউ ইয়র্ক সিটিতে ঘটে যাওয়া এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। শৈত্যপ্রবাহের কারণে তাপমাত্রা নেমে এসেছিল হিমাঙ্কের ৭ ডিগ্রি নিচে। রাস্তায় বের হওয়াই যাচ্ছিল না। অথচ এই শীত উপেক্ষা করে নিউ ইয়র্ক সিটি হলের সামনে উন্মুক্ত প্রান্তরে জড়ো হয়েছিল প্রায় অর্ধলাখ নিউ ইয়র্কার। তারা সাক্ষী হতে চেয়েছিল এক বিরল ইতিহাসের। বিপুল ভোটে বিজয়ী নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম এবং তরুণতম মেয়র জোহরান মামদানির অভিষেক অনুষ্ঠান তারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে ভিড় করেছিলেন এই শীতের দুপুরে। আমার বন্ধু সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট কাজী ফৌজিয়া দুদিন আগেই ফোন করে জানালেন, ট্রানজিশন টিমের সদস্য হিসেবে আমি দু’টি ভিআইপি টিকিট পেয়েছি, একটি আমার জন্য অন্যটি তোমার, তোমাকে অতিথি হিসেবে নিয়ে যেতে চাই। আমিও রাজি হয়ে যাই এই বিরল ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য। কারণ, এই অনন্য ইতিহাসের অংশীদার হতে চাই আমিও। ছুটে যাই সিটি হলের সামনে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে আমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত থাকতে পারিনি, কিন্তু আয়োজনের অংশ তো হয়েছি। এটিই বা কম কী।
এই অনুষ্ঠানে শপথ গ্রহণ করেন তিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, মেয়র জোহরান মামদানি, পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানি উইলিয়ামস ও সিটি কম্পট্রোলার মার্ক লেভিন। জোহরান মুসলিম, তিনি কুরআনে হাত রেখে শপথ নেন, জুমানি খ্রিষ্টান, তিনি বাইবেলে হাত রেখে শপথ নেন এবং লেভিন ইহুদি, তিনি তাওরাতে হাত রেখে শপথ নেন। কী অভিনব এক দৃশ্য। এক মঞ্চে তিন ধর্মের সমান মর্যাদা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি হলো পুরো পৃথিবীর জন্য।
আমি যে কারণে এই রচনায় জোহরানের শপথ অনুষ্ঠানকে টেনে আনলাম তা হচ্ছে কবিতা। হ্যাঁ, এই ঐতিহাসিক অভিষেক অনুষ্ঠানের শৈল্পিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে একটি কবিতা। এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে ‘প্রুফ’ শিরোনামের এক কবিতা পড়েন বর্ষীয়ান কৃষ্ণাঙ্গ কবি ও গীত রচয়িতা কর্নেলিয়াস এডি।
কবিতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়া হচ্ছে নিজেদের সভ্যতা প্রদর্শন। যে জাতি যত সভ্য সেই জাতি তত বেশি শিল্পের মর্যাদা দেয়। কবিতা হচ্ছে শিল্পের সর্বোচ্চ সৃজনশীল মাধ্যম।
প্রতীক্ষায় আছি হয়তো একদিন দেখব বাংলাদেশেও কবিতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এই রচনার মধ্য দিয়ে অনুরোধ জানিয়ে রাখছি, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচনের বিজয়ী দল যখন সরকার গঠন করবে, সেই সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে একজন কবিকে যেন আমন্ত্রণ জানানো হয় কবিতা পড়ার জন্য। তিনি সেদিন এমন এক কবিতা পড়বেন, যে কবিতা বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাবে, পথ দেখাবে এক ইস্পাত দৃঢ় ঐক্যের ও দেশপ্রেমের।



