চট্টগ্রামে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬৬২

চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম নগরীতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৬২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেড়েছে ২৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২৫-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। এটি চট্টগ্রামে পুলিশি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত তৃতীয় সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন।

গতকাল বুধবার নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনের সম্মেলন কক্ষে প্রতিবেদনটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) মো: হুমায়ুন কবির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী এবং চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো: আনিসুর রহমান সোহেল।

প্রতিবেদনে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে নগরীর সড়ক নিরাপত্তার বর্তমান ও অতীত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ধরন, সময়ভিত্তিক প্রবণতা, যানবাহনের শ্রেণিভিত্তিক ঝুঁকি এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এরপর ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মৃত্যুর হার স্থিতিশীল থাকলেও তা নগরীর সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও কার্যকর হস্তক্ষেপের অভাবকে স্পষ্ট করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর সড়কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন পথচারীরা। সাত বছরে মোট নিহতের মধ্যে ৩৬৩ জনই পথচারী, যা মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সময়ে পথচারী মৃত্যুর হার ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অপর্যাপ্ত ফুটপাথ, অনিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা এবং উচ্চগতির যানবাহন পথচারীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

পথচারীদের পর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন দুই ও তিন চাকার যানবাহনের চালক ও আরোহীরা। এই শ্রেণীতে নিহত হয়েছেন ১৯৫ জন। এ ছাড়া ভারী যানবাহন ও বাস সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনাও প্রাণহানীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম নগরীর ২০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বড়পোল মোড়, অলঙ্কার মোড়, সিইপিজেড গেট, সিটি গেট, নিউমার্কেট বাসস্টপ, কালামিয়া বাজার বাসস্টপ ও সাগরিকা গোলচত্বর উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকায় দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক সেফটি অডিট, নকশাগত ত্রুটি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় পুনর্নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

পথচারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে ফুটপাথ প্রশস্তকরণ ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা, উঁচু জেব্রা ক্রসিং নির্মাণ, স্পিড হাম্প ও পথচারী দ্বীপ স্থাপন এবং সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমাতে মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকা ২০২৪ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো: হুমায়ুন কবির বলেন, সড়ক নিরাপত্তা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, সড়ক নকশা ও ব্যবস্থাপনার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি জানান, সিএমপি ইতোমধ্যে রোড সেফটি সেল গঠন এবং রোড ক্র্যাশ তথ্য সংগ্রহে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়ন করেছে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যতে রোড সেফটি সেলই নিয়মিতভাবে সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে, যা নীতিনির্ধারক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো: আনিসুর রহমান সোহেল জানান, প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে সিএমপির সাথে যৌথভাবে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) কর্মসূচির আওতায় বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংস্থা ভাইটাল স্ট্যাটেজিসের সহায়তায় এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশ্বের ২৭টি শহর ও দুইটি রাজ্যের সাথে চট্টগ্রামও এই কর্মসূচির অংশ।