অনিশ্চয়তায় রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় নির্মাণ

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • জমি কিনতেই চার বছর শেষ
  • মূল অবকাঠামো এখনো অধরা!
  • ব্যয় ২৫ শতাংশ ও মেয়াদ ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি

অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির কবলে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের স্বপ্নের রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্পটি। কাগজেই ফুরাল প্রকল্পের মূল মেয়াদ বা চার বছর। প্রকল্পে শুধু জমি কেনাকাটাই সার। দেশের স্বাস্থ্য খাতের অনন্য অর্জনের ঢোল পেটানো হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যে কতটা হতাশার, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ ‘রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) স্থাপন’ প্রকল্প। জমি অধিগ্রহণের বরাদ্দের কানাকড়ি পর্যন্ত (৯৯.৯৯ শতাংশ) খরচ করে ‘কাগজে-কলমে’ শতভাগ সফলতা দেখানো হয়। মূল হাসপাতাল বা একাডেমিক ভবনের মতো দৃশ্যমান ইটের গাঁথুনি এখনো শুরুই করা যায়নি। অথচ এর মধ্যেই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, চার বছর থেকে সাড়ে ৭ বছর। আর ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ২৫ শতাংশ। প্রায় চার বছরে যেটুকু কাজ শুরু হয়েছে, সেখানেও রড-বালি-সিমেন্টের মারাত্মক অনিয়ম আর কারিগরি ত্রুটির জঞ্জাল। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর নিয়োগপ্রাপ্ত ইএসডি কনসালটেন্টসের এক নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষার তথ্য থেকে। সেখানে প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বেগজনক ও চরম সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের চলমান প্রকল্পের প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রমে বাংলাদেশ সরকার উল্লেখযোগ্যভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় উত্তরবঙ্গেও প্রায় দুই কোটি মানুষের চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) স্থাপন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় ২০২২ সালে। দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার মান এবং সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের নিমিত্তে রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা। রাজশাহী জেলা ও এর আশেপাশের প্রায় দুই কোটি জনমানুষকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯ শ’ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক জনবলের শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০০টি অনুষদ (ঋধপঁষঃু) বিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা। চিকিৎসাসেবার মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা।

খরচ ২৫ শতাংশ এবং মেয়াদ ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি

প্রকল্পটির ডিপিপির তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ১৪ জুন রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় নামের এই প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। মূল প্রকল্পটি জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়নে এক হাজার ৮৬৭ কোটি ০৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরতে হয়। অর্থাৎ মূল প্রকল্পটি ৪ বছর বা ৪৮ মাসের জন্য অনুমোদিত ছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর একনেক সভায় জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত ১ বছর সময় বৃদ্ধি এবং খরচ দুই হাজার ২৫৭ কোটি ৯৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা প্রাক্কলিত বৃদ্ধি করা হয়। অর্থাৎ মূল পর্যায়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। আর মেয়াদ ৫ বছরে উন্নীত হয়। এরপর পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ আড়াই বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

প্রায় ৪ বছরে বাস্তব অগ্রগতি ৩৮.৬০ শতাংশ

আইএমইডির সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল প্রায় ৪ বছরে প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৭৭৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, ক্রয় এবং ভূ-উপরিস্থিত বৃক্ষ ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ খাতে বরাদ্দকৃত ৭৫৮ কোটি ৮০ লাখ ৫৭ হাজার টাকার বিপরীতে শতভাগ (৯৯.৯৯ শতাংশ) অর্থ ব্যয় হয়েছে। তবে আরসিসি সীমানা প্রাচীর ও এন্ট্রি-এক্সিট গেট নির্মাণ খাতে অর্থ ছাড়ের কোনো অগ্রগতি দেখানো না হলেও মাঠপর্যায়ে কিছু ভৌত অগ্রগতি সীমানা প্রাচীর ৪৮ শতাংশ ও প্রধান গেট ৭০ শতাংশ দেখা গেছে। বাস্তব অগ্রগতি হলো ৩৮.৬০ শতাংশ এবং অর্থ খরচ হয়েছে ৩৪.৪২ শতাংশ।

নির্মাণকাজে অসঙ্গতি

আইএমইডির ইএসডি কনসালটেন্টস বলছে, সরেজমিন তাদের বেশ কিছু গুরুতর স্পেসিফিকেশন লঙ্ঘন ও কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ইটের গাঁথুনিতে অতিরিক্ত পুরু মর্টার জয়েন্ট এবং অসমসত্ব মর্টার মিশ্রণ। যথাযথ কিউরিং না করা এবং নিম্নমানের বালির ব্যবহার। কলামের শাটারিং প্রপারলি ওভারল্যাপ না হওয়ায় অ্যালাইনমেন্ট বিচ্যুতি। কিছু আরসিসি (জঈঈ) অংশে নির্ধারিত শক্তিমাত্রা অর্জনে ঘাটতি। মান নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় টেস্ট ফ্রিকোয়েন্সি এবং টেস্টিং ফি-র সংস্থান যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকা।

ক্রয় ও বাস্তবায়ন ঝুঁকি

আরডিপিপির তথ্যমতে, প্রকল্পে মোট ৬১টি প্যাকেজের ক্রয় পরিকল্পনা রয়েছে (৪১টি পণ্য, ১৩টি কার্য, ৫টি সেবা ও ২টি ভৌত সেবা)। এর মধ্যে ৪১টি পণ্য প্যাকেজের মাত্র একটি সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি ৪০টি এখনো শুরুই হয়নি। ১৩টি কার্য (পূর্ত) প্যাকেজের ৮টির কাজ চলমান। হাসপাতাল ও একাডেমিক ভবন নির্মাণ শুরু না হওয়ায় চিকিৎসা সরঞ্জাম, সাব-স্টেশন, সেন্ট্রাল এয়ার কুলিং, নার্স কল সিস্টেম, লিফট, ফায়ার হাইড্রেট এবং মেডিক্যাল গ্যাসের মতো জটিল ও আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে আছে। অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও যথাসময়ে এই জটিল যন্ত্রাংশগুলোর প্রকিউরমেন্ট ও ইন্সটলেশন সম্পন্ন না হলে প্রকল্প চালু হতে দীর্ঘ বিলম্ব হতে পারে।