সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫১ শয্যায় উন্নীত হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যা থেকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদ্রুত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়া হবে। অতি দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শূন্য পদে পদায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।

গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো: নূরুল ইসলাম বুলবুলের টেবিল উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্বে বেলা ৩টায় সংসদের বৈঠক শুরু হয়। এর আগে মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল জানতে চান, দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে শূন্য পদে চিকিৎসক ও নার্স দ্রুত পদায়ন এবং গ্রামীণ ও মফস্বল হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত এবং বদলিবাণিজ্য রোধে সরকার বর্তমান কী ধরনের কঠোর ও যুগোপযোগী মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে?

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিসিএসের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ৪৪তম বিসিএসের মাধ্যমে ৯৮ জন সহকারী সার্জন ও ২২ জন ডেন্টাল সার্জন এবং ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে দুই হাজার ৯৮৪ জন সহকারী সার্জন এবং ২৭৯ জন ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪৫তম বিসিএসে ৪৫০ জন, ৪৬তম বিসিএসে ১৬৮২ জন, ৪৭তম বিসিএসে ১৩৩১ এবং ৫০তম বিসিএসে ৬৫০টি সহকারী সার্জন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দুই হাজার ৩৯৪টি শূন্যপদের বিপরিতে পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে ৮২৮ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স সরাসরি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে এবং ১৫৬৬টি সিনিয়র স্টাফ নার্সের শূন্য পদে নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। মিডওয়াইফের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে সম্প্রতি পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে ৫৯৮ জন মিডওয়াইফ পদায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়াসাপেক্ষে পদায়ন করা হবে। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদ্রুত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়া হবে। অতি দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শূন্য পদে পদায়ন করা হবে। চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবলের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিতের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক হাজিরা নিশ্চিত করা হয়েছে। বদলিবাণিজ্য রোধে বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে আছে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক শূন্য ১১ হাজার ৪৯৫ : দেশে প্রায় ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন। তবে মোট চিকিৎসক রয়েছে ৩০ হাজার ৩১১ জন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে ১১ হাজার ৪৯৫ জন। গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বগুড়া-৪ সংসদ সদস্য মো: মোশারফ হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন সংসদে জানান, বর্তমানে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকের অনুমোদিত মোট ৪১ হাজার ৮০৬টি পদের বিপরীতে ৩০ হাজার ৩১১ জন চিকিৎসক কর্মরত এবং ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়। ২০২৬ সালের একটি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানদণ্ড (প্রতি ১ হাজার জনে ০.৫০ জন চিকিৎসক) অনুসারে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন হবে। তবে দেশে চিকিৎসকের সামগ্রিক সংখ্যা এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা এক নয়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের শূন্য পদ পূরণ এবং জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন নিয়োগ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ৪৪তম ও ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমেও সহকারী সার্জন নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, সরকারের চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের জনগণের জন্য সহজলভ্য, মানসম্মত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার হামের টিকা কেনেনি, বরাদ্দ করা অর্থ কোন খাতে খরচ করেছেন?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৯ মাসে হামের টিকা সংগ্রহ না করায় দেশের অনেক শিশু মারা গেছে, অথচ ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের সব টাকা ব্যয় করা হয়েছে। হামের টিকার এই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: সেলিমুজ্জামান মোল্যা। জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে তিনি।

গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: সেলিমুজ্জামান মোল্যা তার প্রশ্নে বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সঠিক সময়ে হামের টিকা সংগ্রহ না হওয়া এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে টিকা সঙ্কটের পেছনে মূল কারণ ছিল টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক নীতি পরিবর্তন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করা।

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৯ মাসে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সঠিক সময়ে হামের টিকা সংগ্রহ না করায় টিকার অভাবে দেশে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের অধিকাংশ অর্থই ব্যয় করেছে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বাজেট বরাদ্দ কত টাকা ছিল; বরাদ্দকৃত অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে?

জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ বিগত দু’টি অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ তুলে ধরেন লিখিত প্রশ্নের জবাবে।

মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর এই অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এবং স্বাস্থ্যসেবা বজায় রাখতে মোট ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় উন্নয়নে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে এই অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। বরাদ্দকৃত অর্থের খাতভিত্তিক ব্যয়ের বিবরণ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত অর্থ মূলত দু’টি প্রধান খাতে ব্যয় করা হয়েছে। ১. পরিচালন খাত : চিকিৎসাকেন্দ্র ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা প্রদান। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ। চিকিৎসা অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক খরচ। ২. উন্নয়ন খাত : নতুন হাসপাতাল ভবন ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সংগ্রহ। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে শিশুদের হাম, রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধক টিকার সংগ্রহ ও দেশব্যাপী বিতরণ। স্বাস্থ্য খাতের জনবলকে দক্ষ করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা।