নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

  • ৫০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন
  • সেনা, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা

আজ সকাল থেকে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। তবে নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক ভোটার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া, ভোট দেয়ার পরের পরিস্থিতি এবং ফল ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া- সব মিলিয়ে নিরাপত্তা প্রশ্নটি সংখ্যালঘু ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় সর্বোচ্চসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে নানা ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা আতঙ্ক আরো বাড়াচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এতে ভোটের পরিবেশ যেমন নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়ছে, তেমনি অনেক এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতেও ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা, হুমকি কিংবা জোরপূর্বক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঘটনার নজির রয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, সংখ্যালঘু ভোটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো নিরাপত্তা। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক ভোটার অবাধ ও নির্ভয়ে ভোট দেয়ার পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। তাদের ভাষায়, ভোট দিতে আগ্রহ থাকলেও জীবন নিরাপদ না হলে ভোটাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা যথেষ্ট নয়। সব রাজনৈতিক দলকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যে দল বা প্রার্থী এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে, তাকেই তারা সমর্থন করবেন বলে জানানো হয়।

বিবিসি বাংলার ফ্যাক্টচেকের ওপর ভিত্তি করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো সংখ্যালঘু নির্যাতনের বহু ছবি, ভিডিও ও পোস্ট ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর। অনেক ঘটনার পেছনে ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক কারণ মুখ্য ছিল। এসব বিষয়কে সামনে রেখে সরকারি বক্তব্যে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নটি অনেক সময় গুরুত্ব পায়নি বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটারদের আচরণ নির্ভর করবে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর- ভোটের পরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা। এই ভোট আচরণই নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটারের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। অনেক আসনে সংখ্যালঘু ভোটার ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। অতীতে এসব আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভোটের ব্যবধান ছিল খুবই কম, ফলে সংখ্যালঘু ভোট এক দিকে গেলে ফল পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট ভোটার প্রায় এক কোটি ১৩ লাখ। এর মধ্যে হিন্দু ভোটার এক কোটি ১০ লাখ, খ্রিষ্টান তিন লাখ ৬৫ হাজার, বৌদ্ধ সাত লাখ ৯০ হাজার এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটার প্রায় ৩০ হাজার।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করেন। বিপরীতে ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার উদ্বিগ্ন এবং ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটগ্রহণকে অনিরাপদ বা অত্যন্ত অনিরাপদ বলে মনে করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৫০৫ জন সংখ্যালঘু ভোটারের ওপর এই জরিপ চালানো হয়।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, নির্বাচনে অনিয়ম হলেও অনেক ভোটার অভিযোগ জানাতে আগ্রহী নন। নিরাপত্তাহীনতা, ভবিষ্যৎ ক্ষতির আশঙ্কা এবং আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাবই এর প্রধান কারণ।

এ দিকে ইসি জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশসহ সর্বোচ্চসংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ড্রোন ক্যামেরাসহ আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসির দাবি, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, সারা দেশে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রায় ২৪ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি থাকবে এবং এসব কেন্দ্রে পুলিশ সদস্যরা বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন। দায়িত্ব পালন করছেন এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ পুলিশ সদস্য ও প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার আনসার। এ ছাড়া আট হাজার র‌্যাব, এক লাখ সেনা সদস্য, উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড ও সীমান্তে বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে- অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।