বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়ায়, যেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা একে-অপরকে জটিলভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত জিডিপি হিসাব এই বাস্তবতাকে সংখ্যার ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছে। অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সঙ্ঘাত- বিশেষ করে চলমান ইরান যুদ্ধ- বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এক নতুন ঝুঁকির অধ্যায় তৈরি করছে। এটি চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) সাময়িক হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.১ শতাংশে। এই হিসাবটি সাময়িক যা পরে হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সংশোধিত হতে পারে। সাধারণত এ ধরনের প্রান্তিক প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের আউটপুট, ভোগ, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রাথমিক তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়। দ্বিতীয় প্রান্তিকের অবস্থাও প্রায় একই রকম থাকতে পারে। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির বড় রকমের প্রভাব পড়তে পারে। যার কারণে চলতি অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভালো কোনো অবস্থা দাঁড়াবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি : অর্থনীতির ভেতরের সঙ্কেত
চূড়ান্ত হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩.৪৯%, যা গত বছরের ৪.২২% থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সাময়িক হিসাবের তুলনায়ও এটি নিচে নেমেছে। অর্থনীতির আকার নমিনাল হিসাবে কিছুটা বেড়ে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার হলেও, বাস্তব প্রবৃদ্ধির এই পতন অর্থনৈতিক গতি হারানোর ইঙ্গিত দেয়।
তিনটি বৃহৎ খাতের চিত্র আরো উদ্বেগজনক- কৃষি : ৩.৩০% থেকে ২.৪২%; শিল্প: ৩.৫১% থেকে ৩.৭১% (সামান্য পুনরুদ্ধার, কিন্তু দুর্বল) এবং সেবায় প্রবৃদ্ধি: ৫.০৯% থেকে ৪.৩৫% এ নেমেছে। বিশেষ করে সেবা খাতের ধীরগতি দেখায়, ভোক্তা ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা চাপের মুখে।
বিনিয়োগ-সঞ্চয়ের পতন : ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সতর্কবার্তা
অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নির্ভর করে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ওপর। কিন্তু সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে- বিনিয়োগ কমে দাঁড়িয়েছে ২৮.৫৪%, দেশজ সঞ্চয় কমে দাঁড়িয়েছে ২১.৯৮%, জাতীয় সঞ্চয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৭.৬৭%- এই প্রবণতা তিনটি বড় সঙ্কেত দেয় যে-বেসরকারি খাতের আস্থা হ্রাস পেয়েছে; ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে তারল্য চাপ বেড়েছে; ভবিষ্যৎ উৎপাদন সমতায় সঙ্কোচন ঘটেছে। অর্থাৎ বর্তমান প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধিও ঝুঁকির মুখে।
বৈশ্বিক প্রোপট : ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাহ্যিক ঝুঁকি এখন মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি। ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে এর প্রভাব বহুস্তরীয় হবে। (ক) জ্বালানি বাজারে ধাক্কা- ব্যয়-স্ফীতির ঝুঁকি : দীর্ঘ ইরান সঙ্ঘাত মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আমদানি বিল বাড়বে; বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শিল্প উৎপাদনে খরচ বাড়বে।
এর ফলে “কস্ট-পুশ ইনফেশন” তৈরি হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে।
(খ) রেমিট্যান্স : অদৃশ্য লাইফলাইন ঝুঁকি : বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সঙ্ঘাত বাড়লে- শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হতে পারে; কর্মসংস্থান কমতে পারে; রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগতে পারে যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে।
(গ) রফতানি খাত : বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্কোচন : ইরান যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। ফলে- ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা কমতে পারে; পোশাক রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে যেতে পারে।
(ঘ) বিনিয়োগ পরিবেশ : অনিশ্চয়তার প্রভাব : যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে চলে। ফলে- বিদেশী বিনিয়োগ কমে যেতে পারে; দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ স্থগিত করতে পারে। এটি ইতোমধ্যেই কমতে থাকা বিনিয়োগ হারকে আরো নিচে নামাতে পারে।
অর্থনীতির সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আগামী অর্থবছরের জন্য তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দাঁড়ায়- সীমিত সঙ্ঘাতে প্রবৃদ্ধি : ৩.৫% থেকে ৪.০% শতাংশে থাকতে পারে। এতেহ অর্থনীতি ধীরগতিতে চলবে, কিন্তু স্থিতিশীল থাকবে
মাঝারি ঝুঁকির ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হতে পারে : ২.৮% থেকে ৩.৫%। এক্ষেত্রে জ্বালানি ও রেমিট্যান্সে চাপ পড়বে, শিল্পে শ্লথতা সৃষ্টি হবে।
উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে- ২.০% থেকে ২.৮% শতাংশ। এক্ষেত্রে “লো-গ্রোথ ট্র্যাপ”-এ আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশের।
সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে- এই বহুমাত্রিক ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কৌশল জরুরি- জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানো; রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ; বেসরকারি বিনিয়োগে কর ও নীতি প্রণোদনা; রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা।
একটি সঙ্কটের প্রান্তে নাকি রূপান্তরের সুযোগ?
২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত জিডিপি হিসাব একটি স্পষ্ট বাস্তবতা সামনে এনেছে- বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বৈশ্বিক সঙ্ঘাত মিলিতভাবে অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এটি শুধু একটি বাহ্যিক ঝুঁকি নয় বরং বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মডেলের সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করবে।
প্রশ্ন এখন একটাই- এই সঙ্কট কি বাংলাদেশকে একটি দীর্ঘমেয়াদি নি¤œ প্রবৃদ্ধির ফাঁদে ফেলবে নাকি এটি হবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ?



