চুক্তির ফাঁদে বিদ্যুৎ খাত

যেভাবে পিপিএ নকশাই বাংলাদেশে অতিরিক্ত বিদ্যুৎমূল্যের কাঠামোগত উৎস হয়ে উঠেছে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও বাড়তে থাকা ভর্তুকির পেছনে সাধারণত দায় চাপানো হয় জ্বালানি সঙ্কট, বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতা কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার ওপর। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যার মূলটি আরো গভীরে-বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পিপিএ-এর নকশায়।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও বাড়তে থাকা ভর্তুকির পেছনে সাধারণত দায় চাপানো হয় জ্বালানি সঙ্কট, বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতা কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার ওপর। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যার মূলটি আরো গভীরে-বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পিপিএ-এর নকশায়।

বিশেষ করে কিইস (ছঊঊঊঝ ) আইন ২০১০-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যেখানে ঝুঁকি প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের জন্য নিশ্চিত ও সুরক্ষিত আয় প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়।

এই বিশেষ প্রতিবেদনে পিডিবি-এর তথ্য ও জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির (এনআরসি) বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে- অতিরিক্ত বিদ্যুৎমূল্য কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত চুক্তিগত ব্যবস্থার প্রত্যাশিত ফল।

জ্বালানি নয়, চুক্তিই ব্যয়ের আসল চালক : অর্থবছর ’২১ থেকে অর্থবছর ’২৪ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের উপাদান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানি ব্যয় বড় অংশ হলেও মোট ব্যয়ের বড় ও স্থায়ী অংশ আসে নন-এস্কেলেবল ক্যাপাসিটি পেমেন্ট (এনইসিপি) এবং বর্ধিত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট (ইসিপি) থেকে।

এই দু’টি উপাদান বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বা দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এগুলো চুক্তিতে একবার বসে গেলে বছরের পর বছর অপরিবর্তিতভাবে পরিশোধ করতে হয়।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, অনাহূত (টহংড়ষরপরঃবফ) প্রকল্পগুলোতে এই স্থায়ী চার্জের হার ধারাবাহিকভাবে বেশি। অর্থাৎ দরপত্রবিহীন, দরকষাকষির মাধ্যমে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোতেই বেশি ‘লক-ইন’ ব্যয় ঢুকেছে।

এতে স্পষ্ট হয়- বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত মূল্য কোনো প্রযুক্তিগত অদক্ষতার ফল নয়, বরং চুক্তির মাধ্যমেই অতিরিক্ত মুনাফা সুরক্ষিত করা হয়েছে। ব্যয় পুনরুদ্ধার থেকে নিশ্চিত আয়ের দিকে যাত্রা : কিইস যুগের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল খরচ পুনরুদ্ধার থেকে রাজস্ব গ্যারান্টি- এর দিকে যাওয়া।

বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, কেবল প্ল্যান্ট ‘উপলব্ধ’ থাকলেই উৎপাদকরা পেতেন পূর্ণ ক্যাপাসিটি চার্জ। ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে- চাহিদা নেই, জ্বালানি নেই, গ্রিডে জায়গা নেই- তবুও রাষ্ট্রকে বসে বসে হাজার হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে।

প্ল্যান্ট সচল, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন কম

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর ’২১ অর্থবছর ’২৪ সময়ে বেশির ভাগ প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ প্রাপ্তি হার ব ছিল ৮৫-৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রযুক্তিগতভাবে এগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর নেমে এসেছে ২০-৩০ শতাংশে।

এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে- সমস্যা প্ল্যান্টে নয়, সমস্যাটি সিস্টেমে। অতিরিক্ত সক্ষমতা, ভুল পরিকল্পনা ও জ্বালানি সঙ্কটের দায় শেষ পর্যন্ত পড়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর।

গ্রহণ নয়তো পরিশোধ করো : রাষ্ট্রের হাত বাঁধা চুক্তি

অনেক পিপিএ-তেই ছিল গ্রহণ নয়তো পরিশোধ করো ধারা। এর অর্থ- বিদ্যুৎ নিলেও দিতে হবে, না নিলেও দিতে হবে।

হাই ফার্নেস অয়েল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক সব প্রকল্পেই দেখা যায়, জ্বালানি ব্যয় প্রায় একই হলেও স্থায়ী চার্জের তারতম্যের কারণে অনাহূত প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎমূল্য বেশি।

এই চুক্তিগুলো পিডিবির-এর খরচ সমন্বয়ের ক্ষমতাকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়।

জ্বালানি ব্যয়ের পূর্ণ পাস-থ্রু : দক্ষতার কোনো পুরস্কার নেই

কিইস চুক্তিগুলোর আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ জ্বালানি খরচ পাস-থ্রু ।

জ্বালানির দাম বাড়লে তার পুরো বোঝা সরাসরি রাষ্ট্র বহন করবে- উৎপাদকদের দক্ষতা বাড়ানোর কোনো প্রণোদনা নেই।

ফলে ঋণ ২০১০-এ যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ২.৭ টাকা, অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ টাকারও বেশি।

ভারতের বিদ্যুৎ সস্তা, আমাদেরটা কেন এত দামি?

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও কম দামের।

এনভিভিএন-এর ২০১২ সালের চুক্তিতে এখনো বিদ্যুৎ আসছে প্রায় ৪.৫ ইউএস সেন্টে।

অন্যদিকে আদানি গড্ডা প্রকল্প- অনুমোদনের সময়ই সর্বোচ্চ দর, পরে সূচকায়ন ও পাস-থ্রু যোগ হয়ে ব্যয় পৌঁছেছে ১৩.৫ ইউএস সেন্টে। এটি কোনো বৈশ্বিক বাস্তবতার ফল নয়, বরং চুক্তিগত নকশার সরাসরি ফল।

ডলার সূচকায়ন ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি : ঝুঁকির সামাজিকীকরণ

ডলারের সাথে সূচকায়ন, সার্বভৌম গ্যারান্টি, বিনিয়োগকারীবান্ধব টার্মিনেশন ক্লজ- সব মিলিয়ে ঝুঁকি গেছে রাষ্ট্রের ঘাড়ে, লাভ গেছে বেসরকারি খাতে।

এমনকি চুক্তি বাতিল করলেও আগে পরিশোধ করতে হবে ঋণ ও মুনাফা- রাষ্ট্রের দাবির কোনো অগ্রাধিকার নেই।

এসএস পাওয়ার : একটি অনুমোদন, দুই ইউনিট, বহু দশকের দায়

এসএস পাওয়ার-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, দু’টি ইউনিটকে কার্যত একটি প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়।

ফলে একবার অনুমোদনের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয়- দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত আয়, একাধিক ইউনিটে একই সুবিধা, পুনর্মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। এটি ব্যতিক্রম নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।

দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত কাঠামো

এই অনুসন্ধানে স্পষ্ট- বিদ্যুৎখাতের অতিরিক্ত মূল্য কোনো জরুরি সিদ্ধান্তের অনিচ্ছাকৃত ফল নয়।

এটি ছিল এমন এক ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি, যেখানে- প্রতিযোগিতা বাদ, দরকষাকষি প্রাধান্য, ঝুঁকি রাষ্ট্রের, মুনাফা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর।

চুক্তির নকশা বদলানো ছাড়া, ঝুঁকি বণ্টন ভারসাম্যপূর্ণ না করা ছাড়া, বিদ্যুৎখাতের এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। সংস্কার যদি চুক্তিতে না আসে, সংস্কার কাগজেই থেকে যাবে।