বিশেষ সংবাদদাতা
শুল্কনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা উৎসাহব্যঞ্জক বলে দাবি করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেন, আমরা দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শেষ করে আবার প্রস্তুতি নিচ্ছি তৃতীয় রাউন্ডের আলোচনার জন্য। এরপর খুব শিগগিরই আমরা যুক্তরাষ্ট্রে যাবো। আমরা আশা করছি একটা ভালো আউটকাম আসবে। আমাদের আলোচনাগুলো উৎসাহব্যঞ্জক। আশা করছি যুক্তরাষ্ট্র যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণ করবে।
গতকাল বিকেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ অ্যাগ্রিমেন্টের খসড়াবিষয়ক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। এ সময় তাকে সহায়তা করেন বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান। ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে কথা বলেন বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা ‘নন ডিসক্লোজার’ হিসেবে অভিহিত করে সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা রোববার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছি আমাদের দ্বিতীয় রাউন্ডের আলোচনা শেষ করে। আলোচনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা স্টেকহোল্ডারদের সাথে কথা বলেছি। আবার প্রস্তুতি নিচ্ছি তৃতীয় রাউন্ডের আলোচনার জন্য। এরপর আমরা যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যাব। আমরা আশা করছি একটা ভালো আউটকাম আসবে। তিনি বলেন, আমাদের আলোচনাগুলো উৎসাহব্যঞ্জক। আলোচনাটা যথেষ্ট এনগেজিং ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথেও আমার বৈঠক হয়েছে। দফাওয়ারি আমাদের সাথে যারা নেগোশিয়েশনে যুক্ত ছিলেন তাদের ৩৫-৪০ জনের সাথে আমাদের কথা হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, আমাদের মধ্যে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। আমরা সেখান থেকে বেশ কিছু পরামর্শ পেয়েছি। অবশ্য এ পরামর্শগুলো আমরা আমাদের মধ্যেই নির্দিষ্ট রাখব। আমরা আশা করছি এই আলোচনার মাধ্যমে আমাদের জন্য একটি যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণ করবে রফতানির ওপরে।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসা করি। ২০১৫ সাল থেকে আমরা শুল্ক পরিশোধ করে ব্যবসা করছি। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে এই ব্যবসা করে থাকে। যদি তুলনামূলকভাবে আমাদের সাথে কোনো বৈষম্যমূলক অবস্থান তৈরি না হয় তাহলে আমাদের ব্যবসায়ীরা সফলতার সাথে ব্যবসা করে যাবে।
যৌক্তিক শুল্কহারের কথা বলা হচ্ছে। আসলে কত শতাংশ শুল্ককে যৌক্তিক মনে করছেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শূন্য’।
নেগোশিয়েশনের কোন পর্যায়ে আমরা রয়েছি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো আলোচনা করি। আমাদের তো আশা আছে এটাকে (শুল্কহার) শূন্যতে নিয়ে আসা। তবে এ বিষয়ে আমাদের ‘নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’ রয়েছে। সুতরাং অ্যাগ্রিমেন্টবিষয়ক কোনো প্রশ্নের উত্তর আমরা দেবো না।
১ আগস্ট থেকে পাল্টা শুল্ক পুনঃআরোপিত নাকি নতুন শুল্কহার পাওয়া যাবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা যৌক্তিক শুল্ক নির্ধারণ করবে। কারণ আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসা করছে। ২০১৫ সাল থেকে শুল্ক-কর পরিশোধ করেই সেটা করছি। আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে এ ব্যবসা করছে এবং তুলনামূলকভাবে আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সাথে বৈষম্যের শুল্ক না হলে আমরা সেটা করে যাবো।
চীনের সাথে ব্যবসা নিরুৎসাহিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো শর্ত দিচ্ছে কি না- জানতে চাইলে উপদেষ্টা এর কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, আমরা নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট নিয়ে কোনো প্রশ্নের জবাব এখন দেবো না। এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই।
বাণিজ্যসচিব বলেন, মে মাসের ২৭ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রেসিপ্রোরেকেল চুক্তির একটি খসড়া পাঠানো হয়েছে। সেটির ওপর আমরা কাজ করেছি। সেটি নিয়ে একাধিকবার তাদের সাথে আলোচনা করেছি। সর্বশেষ নেগোসিয়েশন হয়েছে এ মাসের ৯, ১০, ১১ তারিখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে বাণিজ্য উপদেষ্টা ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাও অংশ নিয়েছেন। আমরা ঘনিষ্ঠভাবে তাদের সাথে এনগেইজড আছি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের ওপর এই পরিমাণ শুল্কে চাপ না আসে তার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
আজকের বৈঠক বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএ নেতা হাতেম বলেন, আমাদের সাথে যে আলোচনা হয়েছে তাদের আমরা খুবই সন্তুষ্ট। এটি আমাদের জন্য বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে অতিরিক্ত সচিব (ডব্লিউটিও) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো: হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ নিটওয়ার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের ৬০ দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেন। সে সময় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে ৭ এপ্রিল তিন মাসের জন্য তা স্থগিতও করা হয়। যার মেয়াদ ছিল ৯ জুলাই পর্যন্ত। গত ৮ জুলাই প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে পাঠানো এক চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে তারা ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। তবে তিনি এও বলেন, এটি আলোচনা হতে পারে।



