অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দরপতনের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির প্রায় ৬৫ শতাংশ দরপতনের শিকার হলেও দিনশেষে লেনদেন বেড়েছে। তিন কার্যদিবস পর আবারো হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে ডিএসইর লেনদেন। গতকাল ডিএসইতে মোট এক হাজার ২৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে। এর আগে গত ২২ এপ্রিল ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৫৬ কোটি টাকা। বাজার বিশ্লেষকরা লেনদেনের এই উন্নতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও বাজারে সূচকের নেতিবাচক প্রবণতা থাকলেও ডিএসইর লেনদেন সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। অতীতে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যেকোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও কমে যেত। এবার সে চিত্র দেখা যায়নি। বরং দেশের দুই পুঁজিবাজারেই বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বেড়েছে।
তাদের মতে, বাজার ভালো বা খারাপ- যে অবস্থাতেই থাকুক, বিনিয়োগকারীরা বাজারের সাথে রয়েছেন, এটিই তার প্রমাণ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। তবে গতকাল ডিএসইতে লেনদেনে চমক দেখিয়েছে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক (এনসিসি ব্যাংক)। কোম্পানিটি গত অর্থবছরের জন্য ২১ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ১৭ শতাংশ নগদ ও ৪ শতাংশ বোনাস।
এ ঘোষণার পর কোম্পানিটির শেয়ারদরে উল্লম্ফন ঘটে এবং লেনদেনও বেড়ে যায়। গতকাল ডিএসইতে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে কোম্পানিটির। একই সাথে ৮৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা মোট লেনদেনের প্রায় ৮ শতাংশ। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ কোম্পানিই দরপতনের শিকার হয়। ফলে প্রধান সূচক নামমাত্র বাড়লেও বিশেষায়িত দু’টি সূচকের অবনতি ঘটে।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮ দশমিক ৩২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩০০ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট থেকে দিনশেষে ৫ হাজার ৩০৮ দশমিক ৮৯ পয়েন্টে স্থির হয়। এ সময় ডিএসই-৩০ সূচক ১ দশমিক ৩১ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট কমেছে।
অন্য দিকে সোমবারের মতো গতকালও সব সূচকে উন্নতি ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৩ দশমিক ১০ পয়েন্ট বেড়েছে। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচক যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ৪৯ ও ২১ দশমিক ৪২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ কোম্পানি দরপতনের শিকার হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে টানা মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া বীমা খাতের কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানি গতকালও দুই বাজারের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিলেও খাতটিতে সংশোধন দেখা গেছে। বীমা খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির দর কমেছে। অন্য দিকে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি কোম্পানি। এর মধ্যে ছিল এনসিসি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক। এ ছাড়া অন্যান্য খাতগুলোতে পতনের পাল্লাই ছিল ভারী।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির আর্থিক নিরীক্ষায় অবহেলা ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে তিন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্ম ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেড এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের গরমিল থাকা সত্ত্বেও ‘স্বচ্ছ’ নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেয়ার দায়ে তিনটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০১৮ অর্থবছরের নিরীক্ষায় জমি ক্রয় ও এফডিআরসংক্রান্ত বড় ধরনের অসঙ্গতি এড়িয়ে গেছে। এ দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এক বছরের জন্য এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদার মো: আবু কায়সারকে দুই বছরের জন্য তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের নিরীক্ষা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রিং শাইন টেক্সটাইলের ২০১৮ হিসাব বছরের নিরীক্ষায় প্রায় সব আর্থিক সূচকে জালিয়াতি ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় একই প্রতিষ্ঠানকে তিন বছরের জন্য এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদার মো: আব্দুস সাত্তারকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বিএসইসির এ আদেশ জারির আগে যেসব তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের নিরীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেগুলো দুই প্রতিষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
রিং শাইন টেক্সটাইলের ২০১৯ হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নগদপ্রবাহ ও শেয়ারমানি ডিপোজিটসংক্রান্ত গুরুতর তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়ায় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আতা খান অ্যান্ড কোম্পানিকে তিন বছরের জন্য বিএসইসির অডিটর প্যানেল থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীদার মকবুল আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একইভাবে রিং শাইন টেক্সটাইলের ২০২০ হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অডিটিং স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনের দায়ে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানিকে তিন বছরের জন্য এবং এর অংশীদার রামেন্দ্র নাথ বসাককে পাঁচ বছরের জন্য অডিটর প্যানেলে অন্তর্ভুক্তির অযোগ্য ঘোষণা করেছে কমিশন।



