২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল সেই দিনে রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় মিরপুরের ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ফয়জুল ইসলাম রাজন। কিন্তু পরিবারের কাছে সবচেয়ে যন্ত্রণার স্মৃতি হয়ে আছে তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগের একটি ফোনকল। মাকে সে বলেছিল, “মা, আমাকে মাফ করে দিও।” মা তাকে ঘরে ফিরে আসতে অনুরোধ করেছিলেন, আন্দোলনে না যেতে বলেছিলেন। কিন্তু সেই কথোপকথনই হয়ে ওঠে মা-ছেলের শেষ আলাপ। সন্ধ্যায় আসে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর, গভীর রাতে পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয় রাজনের লাশ। সেই থেকে রক্তমাখা স্মৃতি, অপূর্ণ স্বপ্ন আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষা নিয়েই দিন কাটছে তার পরিবারের।
রাজনের বড় ভাই রাজিব জানান, ১৯ জুলাই বেলা ১১টার দিকে তাদের মা ফোন করে জানান, রাজনের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনিও বারবার ফোন করলেও কোনো সাড়া মেলেনি। দুপুর ১২টার দিকে মা জানান, রাজনের সাথে তার কথা হয়েছে। রাজন মাকে বলেছিল, মা, আমাকে মাফ করে দিও। আমার যদি কোনো ভুল-ত্রুটি থাকে, আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। মা তখন ছেলেকে আন্দোলনে না যেতে অনুরোধ করে বলেন, তোর যদি মাফ চাইতে হয়, বাসায় এসে চাইবি। বাইরে যাস না, অনেক গুলি হচ্ছে।
কিন্তু কথার মাঝেই ফোন কেটে যায়। এরপর আর কোনো কল ধরেনি রাজন। পরিবারের সবাই পালাক্রমে ফোন করলেও কোনো উত্তর মেলেনি। রাজিব তখন মাকে সান্ত¡না দিয়ে বলেছিলেন, হয়তো নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বিকেলে কাজ শেষে বাড়ি ফেরেন রাজিব। সন্ধ্যার আজানের কিছুক্ষণ পর অচেনা একজন রাজনের মায়ের ফোনে কল করেন। জানতে চান পাশে কেউ আছে কিনা? এরপর পাশে থাকা বড় ছেলের সাথে কথা বলতে চান তিনি।
রাজিব বলেন, ফোনে একজন জানায়, রাজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মিরপুর আজমল হাসপাতালে আছে। এরপর প্রশ্ন করা হয়, আমরা লাশ নেব কি না। না নিলে অন্য ব্যবস্থা করা হবে। কথাটা শুনেই মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। আমরা বললাম, ভাইয়ের লাশ অবশ্যই আমরা নিয়ে আসব।
রাজিব জানান, ছোট বোন হাসপাতালে গিয়ে দেখে রাত ৮টার দিকে সে ফোন করে নিশ্চিত করে যে, নিহত ব্যক্তি সত্যিই রাজন। তখন হাসপাতালের সামনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, গোলাগুলি এবং যানবাহনের সঙ্কটের কারণে দীর্ঘ সময় লাশ নেয়া সম্ভব হয়নি। অবশেষে রাত প্রায় দেড়টার দিকে হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সে রাজনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাকে কেরানীগঞ্জের উত্তর বায়েরচর গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয়।
রাজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার নিয়ে আশাবাদী নন পরিবার।
রাজিব বলেন, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ওপর এখন আর তেমন ভরসা পাই না। তাই মামলার খোঁজও খুব একটা রাখি না। তার মা এখন আর বিচারের কথা তুলতেও চান না। ছেলেকে হারানোর শোক তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। শহীদ রাজনের মায়ের ভাষায়, এসব নিয়ে আর কিছু করার নেই। আমার একটা সন্তান চলে গেছে। আল্লাহ যেন দেশে শান্তি ফিরিয়ে দেন, এটাই চাই। বিচার হলে ভালো, না হলেও আল্লাহর কাছেই বিচার রইল।



